‘যখন ক্ষমতা ছেড়ে এলাম, তখন তেল-গ্যাস-বিদ্যুত্, রাস্তা-ঘাট সবই তো ছিল। সবার মাঝে জীবন উন্নয়নের স্বপ্ন চোখে-মুখে ফুটিয়ে তুলেছিলাম। মাঝখানে কেটে গেল প্রায় ২৫ বছর। উন্নয়নের ধারাবাহিকতা থাকলে দেশ এখন অন্য এক উচ্চতায় থাকার কথা। কিন্তু এখন কী দেখছি! যেদিকেই চোখ যায়-শুধু নাই, নাই, আর নাই। টাকা ছিল না, পয়সা ছিল না। তারপরেও কত বড়-বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছি। ২৫ বছরে কোনো ম্যাগা প্রকল্প কেউ দেখেছে? কেন এমন হলো?’ এই প্রশ্ন সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টি (জাপা) চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদের।
সম্প্রতি ইত্তেফাক প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে নিজের নয় বছরের শাসনামলের সঙ্গে পরবর্তী ২৫ বছরের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে হতাশার সুরে এই প্রশ্ন রাখেন তিনি। মুখে হাত রেখে উপরের দিকে তাকিয়ে এরশাদ বলেন, ‘ভেরি আনকাইন্ড। আমি কোনো খারাপ কাজ করিনি। ’৯০ এ কেন আন্দোলন হলো! খামোখা। কী পেল দেশটা? আই নিড অ্যানাদার চান্স। নতুন প্রজন্ম হয়তো এখন ইতিহাসকে ভিন্নভাবে মূল্যায়ন করবে।’
নিজ শাসনামলে কিছু প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের পথে নানামুখি প্রতিবন্ধকতা স্মৃতিচারণ করে এরশাদ বলেন, আমি সারাদেশ ঘুরতাম। পান্থপথের সড়কটি যখন নির্মাণের উদ্যোগ নেই, তখন স্থানীয়রা প্রবল বাধা হয়ে ওঠে। মনে আছে, আমি তখন সেখানে ঘরে-ঘরে যাই। বলেছিলাম-আপনাদের জন্যই এই সড়ক দরকার। কুমিল্লা, চট্টগ্রাম ও সিলেটসহ ওই এলাকার যানবাহনের ঢাকায় প্রবেশের একটি মাত্র সড়ক ছিল। যাত্রাবাড়ি থেকে টিকাটুলি হয়ে। ভাবলাম, এটা হতে পারে! পরে সায়েদাবাদ থেকে মুগ্দা, বাসাবো হয়ে রামপুরার দিকে যে সড়কটি করেছি, সেখানে তখন ঝিল ও বস্তি ছিল। গাড়ি নিয়ে যাওয়ার কোনো উপায় ছিল না। আমি হেলিকপ্টার দিয়ে উপর থেকে ম্যাপ নিয়েছিলাম। রাজউকের কর্মকর্তারা আমাকে বলেছিল-স্যার এখানে রাস্তা অসম্ভব, ১৮৫টি বাড়ি ভাঙতে হবে। আমি বললাম, ‘আই ওয়ান্ট দিস্ রোড, আমি এমন কর্মকর্তা দেখতে চাই-যিনি বলবেন, এটা সম্ভব।’ শেষ পর্যন্ত আই ডিড ইট, এই হলো আজকের ওই সড়কের জন্মকথা। ডিএনডি বাঁধ, বিজয় সরণি ও প্রগতি সরণি সড়ক, আশুলিয়া সড়কও নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে বাস্তবায়ন করেছি। এখনও মনে আছে, যিনি আমার যোগাযোগ মন্ত্রী ছিলেন-আশুলিয়া সড়কের নির্মাণ কাজ শুরু করতে গিয়ে তিনি নিজে সেদিন বাঁশ হাতে ধরে পানিতে নেমেছিলেন। কষ্ট লাগে, ২৫ বছরে কোনো সরকার ঢাকায় এমন একটি সড়ক করতে পেরেছে? এই প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, বরেন্দ্র প্রকল্প যখন গ্রহণ করি তখন সেটি ছিল মরুভূমি। আমি সেখানে ৬ হাজার গভীর নলকূপ বসাই। সেই বরেন্দ্র ভূমি এখন কী সবুজ!
নিজ শাসনামলে বিদ্যুত্ ও খনিজ সম্পদ খাতের কার্যক্রম সম্পর্কে এরশাদ বলেন, দেশের পূর্ব-পশ্চিম আন্তঃযোগাযোগ স্থাপনের ফলে প্রতিদিন ৩৪ লাখ টাকার জ্বালানি খরচ সাশ্রয় হতো। আশুগঞ্জে ৬০ মেগাওয়াট শক্তিসম্পন্ন একটি বিদ্যুত্ উত্পাদন প্লান্ট চালু করেছিলাম। ’৯০ এ যখন ক্ষমতা ছেড়ে আসি তখন চট্টগ্রাম, কাপ্তাই, বরিশাল, ঘোড়াশাল ও আশুগঞ্জে বিদ্যুত্ উত্পাদন স্টেশন নির্মাণকাজ সমাপ্তির পর্যায়ে ছিল। প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধির ফলে বিদ্যুত্ উন্নয়ন বোর্ডের প্রথম এক বছরে রাজস্ব আয় দাঁড়ায় ৫শ’ কোটি টাকা। ১২৬টি উপজেলায় বিদ্যুতায়নের বিশেষ প্রকল্প নিয়েছিলাম। পরে অন্যান্য উপজেলাও এই প্রকল্পভুক্ত হয়। মাত্র ২ বছরে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড ৫ হাজার মাইল বিতরণ লাইন স্থাপন করে। জরুরি ভিত্তিতে বাখরাবাদ গ্যাস ক্ষেত্রের সঙ্গে তিতাস গ্যাসের সংযোগের জন্য ৩২ মাইলব্যাপী ২০ ইঞ্চি লাইন স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিই। জয়পুরহাট কঠিন শিলা খনি এবং সিমেন্ট উত্পাদন প্রকল্পের নীতিগত অনুমোদন আমারই দেয়া।
‘আপনার ভাষায় আপনি অনেক উন্নয়ন করেছেন, বড় বড় প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেছেন। এটি করতে পারার পেছনে কোন বিষয়গুলো বেশি ভূমিকা রেখেছে?’- এই প্রশ্নের জবাবে জাপা চেয়ারম্যান বলেন, ‘প্রথমত, যেহেতু আমি সেনাপ্রধান ছিলাম, সে জন্যই আমার প্রশাসনিক ব্যাকগ্রাউন্ড ছিল। একটা ভিশনও ছিল। আমি যখন মনে করেছি এটি হওয়া দরকার, নির্দেশ দিয়েছি-কাজ শুরু হয়ে যেতো। একটি যোগ্য প্রশাসন ছিল, সেখানে দলীয়করণ ছিল না। কোনো বিষয়ে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা সৃষ্টিরও সুযোগ ছিল না। প্রকল্পে কোনো ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ হতো না, টেন্ডারবাজি-চাঁদাবাজি ছিল না। যমুনা সেতুর জন্য সারচার্জ বসিয়ে ৬শ’ কোটি টাকার তহবিল গঠন করেছিলাম। গণচীনের সহায়তায় বুড়িগঙ্গা, জাপানের সহায়তায় মেঘনা ও গোমতী, টেকেরহাটসহ নয় বছরে ৫০৮টি বড় বড় ব্রিজ করেছি। এভাবে দেশে প্রথমবারের মতো পাঁচটি ইপিজেড (রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল) করেছি। ১৯৮৩ সালে দেশে কোনো বেসরকারি ব্যাংক ছিল না। পূবালী ও উত্তরা ব্যাংককে বাঙালি মালিকানায় ফেরত আনি। ১৮টি বীমা কোম্পানি করেছিলাম।১৯৮৫ থেকে ৮৬ সালের মধ্যে দেশে প্রায় দেড়শ’ গার্মেন্টস কারখানা প্রতিষ্ঠা হয়। গ্রামীণ ব্যাংকের যাত্রাও শুরু হয় আমার আমলে। বিদেশে শ্রমবাজার তৈরি করি। সারাদেশে গ্রামে-গ্রামে যোগাযোগের জাল বিছিয়ে দেয়ার লক্ষ্যে এলজিইডি (স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর) প্রতিষ্ঠা করেছিলাম। আমার এখনও মনে পড়ে, এক সময় ঢাকা থেকে ঠাকুরগাঁও যেতে আমার তিনদিন লাগতো। কিছু পথ যেতাম গরুর গাড়িতে। গিয়ে একরাত থাকতে হতো, আবার কিছুদূর যেতাম নৌকায়। সেই গরুর গাড়ি এখন জাদুঘরে ঠাঁই নিয়েছে।’
সাবেক এই রাষ্ট্রপতি বলেন, জাতীয় নীতি হিসেবে সকল উপজেলার সঙ্গে পাকা সড়কের যোগাযোগকে আমরা অগ্রাধিকার দিয়েছিলাম। মাত্র ২ বছরের মধ্যেই ২০৬টি উপজেলায় সড়ক নির্মাণের কাজ শুরু করি। মাওয়া হয়ে ঢাকা-খুলনা বিকল্প রাস্তা নির্মাণ করি। কেন এসব করতে পেরেছিলাম। কারণ আমার বেস্ট কেবিনেট ছিল। মেধাবী ও যোগ্যদের খুঁজে-খুঁজে বের করে মন্ত্রী করেছিলাম। প্রত্যেক মন্ত্রী তখন নোটবুক রাখতেন। কেবিনেট মিটিংয়ে আমি নিজেও নোটবুক নিয়ে বসতাম। কোন মন্ত্রণালয়ের কোথায় কী সমস্যা, আগেই নোটবুকে টুকে রাখতাম। কেবিনেট মিটিং থেকেই অনেক সমাধান দিতাম। কোনো একটি প্রকল্প গ্রহণ করলে, প্রতি মাসে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর কাছ থেকে অগ্রগতি প্রতিবেদন নিতাম। একদিন রাতে আমার কাছে খবর এলো-একটি সড়কে সমস্যা হয়েছে। আমি মন্ত্রীকে ফোন করে বললাম-চলুন এখনই সেখানে যাবো। মন্ত্রী আমাকে বলেছিলেন-‘স্যার আপনি ঘুমান, মন্ত্রী হিসেবে এটি আমার দায়িত্ব, আমি দেখছি। এই ছিল আমার মন্ত্রীরা।’
এরশাদের সঙ্গে এই আলাপচারিতার সময় উপস্থিত থাকা জাপা মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু বলেন, একটি দেশকে এগিয়ে নিতে হলে সর্বাগ্রে দরকার সুশাসন। আগে উন্নয়ন ও সুশাসন হাত ধরে হাঁটতো।

