টানা বৃষ্টিপাত, উজানের ঢল ও জোয়ারে ১১ জেলায় আবারও বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।

Seba Hot News
 টানা বৃষ্টিপাত, উজানের ঢল ও জোয়ারে ১১ জেলায় আবারও বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। গতকাল বুধবার দেশের ২৩টি নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এর মধ্যে ২৮টি পয়েন্টের পানি তুলনামূলক কমলেও ৫৩টি পয়েন্টে বিভিন্ন হারে পানি বেড়েছে। ঢাকার বুড়িগঙ্গাসহ আশপাশের নদীর পানি আগের দিনের মতোই বেড়ে আছে। এ অবস্থা আরো কয়েক দিন থাকতে পারে বলে সরকারের বন্যা পূর্বাভাস ও সর্তকীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে।
এদিকে হবিগঞ্জ, নওগাঁ, নীলফামারী, গাইবান্ধা, চাঁদপুর, কুড়িগ্রাম, পিরোজপুর, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ ও রাজবাড়ীর লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। অনেকেই বাঁধসহ উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। তারা বিশুদ্ধ পানি ও খাবার সংকটে অসহায় জীবন যাপন করছে। ক্রমান্বয়ে পানিবাহিত রোগবালাই বাড়ছে। সে ক্ষেত্রে বন্যার্তরা পাচ্ছে না প্রয়োজনীয় ওষুধ। বন্যাকবলিতরা জানিয়েছে, তাদের কাছে এখনো ত্রাণ পৌঁছায়নি। কোথাও পৌঁছালেও তা প্রয়োজনের তুলনায় কম।
অন্যদিকে গত তিন দিনে রংপুরের গঙ্গাচড়ায় ৮০ পরিবারের ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে শত শত একর রোপা আমনের জমি ও শাকশবজির ক্ষেত তালিয়ে যাওয়ায় নিঃস্ব হতে বসেছে কৃষকরা।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র সূত্র জানায়, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীর পানি সমহারে বাড়ছে, যা আগামী ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। এ ছাড়া গঙ্গার পানি কমলেও পদ্মা নদীর পানি বাড়ছে। ঢাকা মহানগরীসংলগ্ন নদীগুলোর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা আগামী ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। এ ছাড়া দেশের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের নদীগুলোর পানিও বাড়ছে। আগামী ৪৮ ঘণ্টা পর তা কমার সম্ভাবনা রয়েছে। উত্তর-মধ্যাঞ্চলেও আগামী ৪৮ ঘণ্টায় কিছু জেলার বন্যা পরিস্থিতির পর্যায়ক্রমে অবনতি হতে পারে। গতকাল ১০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে দেশের দুটি স্থানে আর ৫০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি হয়েছে ১১টি স্থানে। এর মধ্যে কক্সবাজারে সর্বোচ্চ ১৭০ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সহকারী প্রকৌশলী রিপন কর্মকার জানান, ৮৫টি পয়েন্টের পর্যবেক্ষণ অনুসারে বুধবার ৫৩টি পয়েন্টে পানি বেড়েছে। এর মধ্যে ২৩টি নদীর পানি বিপৎসীমার বিভিন্ন হারের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
বিস্তারিত আমাদের আঞ্চলিক অফিস, নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে-
হবিগঞ্জ : হবিগঞ্জ দিয়ে প্রবাহিত নদ-নদীতে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। কুশিয়ারা নদীর পানি বেড়ে আশপাশের এলাকা প্লাবিত হয়েছে। ফলে সেখানকার হাজারো মানুষ দুর্ভোগে রয়েছে। ইতিমধ্যে নবীগঞ্জের দীঘলবাঁক ইউনিয়নের দীঘলবাঁক, কসবা, চরগাঁও, উমরপুর, গালিমপুর, মাধবপুর, কুমারকাদা, আহম্মদপুর, ফাদুল্লা, রাধাপুর, জামারগাঁও ও রাধাপুরের বেশ কিছু এলাকা প্লাবিত হয়েছে।
নওগাঁ : দুই দিন ধরে নওগাঁর মান্দায় আত্রাই ও শাখা নদী ফকির্নীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। আত্রাই নদীর সাতটি বেড়িবাঁধ ভেঙে নতুন করে ১৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। অনেক পরিবার বাঁধের ওপর আশ্রয় নিয়েছে। পর্যাপ্ত ত্রাণ না পৌঁছায় অসহায় জীবনযাপন করছে বন্যাকবলিত মানুষ।
নীলফামারী : নীলফামারীতে তিস্তার নদীর পানি কিছুটা কমলেও এখনো বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অনেকেই বাড়িঘর ছেড়ে বাঁধে আশ্রয় নিয়েছে। সেখানকার বাড়িঘরে কোমর পরিমাণ পানি রয়েছে। ওই গ্রামের প্রায় ২৫ থেকে ৩০টি পরিবার তিন দিন ধরে বাঁধে রাত কাটাচ্ছে।
গাইবান্ধা : গাইবান্ধায় ঘাঘট, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও করতোয়া নদ-নদীর পানি মঙ্গলবার রাত থেকে নতুন করে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফসলের ক্ষেতে পানি থাকায় নতুন করে আমন চারা বা সবজি চাষ করতে না পারায় কৃষকরা বিপাকে। বন্যা দীর্ঘায়িত হলে শাকসবজি ও রোপা আমন ধান উৎপাদন বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা করছে কৃষকরা।
চাঁদপুর : চাঁদপুরের মেঘনা নদীর পানি বেড়েছে। ফলে জেলার হাইমচরের দুর্গম সাতটি চরের প্রায় ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। সেখানে গতকাল দুপুরে হাইমচর উপজেলা পরিষদের পক্ষ থেকে বন্যার্তদের মধ্যে শুকনো খাবার, খাবার স্যালাইন ও পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ করা হয়েছে।
কুড়িগ্রাম : কুড়িগ্রামের নদ-নদীর পানি বাড়তে থাকায় বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। ধরলা নদীর পানি বিপৎসীমার ৪৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় এক লাখ মানুষ। বন্যায় প্রায় ৫৬ হাজার হেক্টর জমির ফসল নিমজ্জিত রয়েছে।
রংপুর : গঙ্গাচড়ায় বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিস্তার ভাঙন শুরু হয়েছে। গত তিন দিনে গঙ্গাচড়ায় ৮০ পরিবারের ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙন অব্যাহত থাকায় হুমকির মুখে রয়েছে মূল বাঁধসহ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ভাঙন ঠেকাতে বাঁশের পাইলিংসহ বিভিন্নভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে স্থানীয়রা। আলমবিদিতর ইউনিয়নের পাইকান, কোলকোন্দ ইউনিয়নের চিলাখাল ও লক্ষ্মীটারি ইউনিয়নের পূর্ব ইছলী এলাকার লোকজন তাদের ঘরবাড়ি অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছে।
পিরোজপুর : জোয়ারে নদ-নদীতে পানি বাড়ায় পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়ায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়েছে। ফলে তিন দিন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। পশ্চিম ভিটাবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের পাঠদান বন্ধ হয়ে গেছে।
সিরাজগঞ্জ : সিরাজগঞ্জে যমুনার পানি বাড়ায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। প্রায় দুই সপ্তাহ যাবৎ জেলার কাজীপুর, বেলকুচি, চৌহালী ও সদর উপজেলার ২৯টি ইউনিয়নের অন্তত ১০ হাজার পরিবার পানিবন্দি রয়েছে। বন্যাকবলিত এলাকায় দেখা দিয়ে শুকনো খাবার আর বিশুদ্ধ পানির সংকট। সেই সঙ্গে দেখা দিয়েছে বিভিন্ন পানিবাহিত রোগ।
জামালপুর : জামালপুরের ইসলামপুর ও সরিষাবাড়ী উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের কমপক্ষে ২০টি গ্রাম প্লাবিত হয়ে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়েছে। জেলার ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ, মাদারগঞ্জ ও সরিষাবাড়ী উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে কৃষকদের রোপা আমন ফসল তলিয়ে গেছে। ২৫ হাজার পানিবন্দি মানুষের মধ্যে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট।
রাজবাড়ী : পদ্মার পানি কমতে থাকলেও রাজবাড়ীর কালুখালীর রতনদিয়ার কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছে। তারা বিশুদ্ধ পানি ও খাবার সংকটসহ বিভিন্ন রোগে ভুগছে। দুই ফুট পানির নিচে রয়েছে সেখানকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
মুন্সীগঞ্জ : মুন্সীগঞ্জে পদ্মা নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। শ্রীনগর, লৌহজং ও টঙ্গীবাড়ির নিম্নাঞ্চল জলমগ্ন রয়েছে। বর্ষণে শহরসহ বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। পরিবেশ বিজ্ঞানী আরিফুর রহমান জানান, বন্যার আর কোনো শঙ্কা নেই। সাগরে নিম্নচাপের কারণে পানি নামতে একটু বিলম্ব হচ্ছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
আবহাওয়ার পূর্বাভাস : রাজশাহী, রংপুর, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় অস্থায়ী দমকা অথবা ঝোড়ো হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে বরিশাল, চট্টগ্রাম, ঢাকা ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারি থেকে অতি ভারি বর্ষণ হতে পারে। এ ছাড়া দেশের অন্যত্র মাঝারি ধরনের ভারি থেকে ভারি বর্ষণ হতে পারে। পাশাপাশি সারা দেশে দিন এবং রাতের তাপমাত্রা সামান্য হ্রাস পেতে পারে।
ট্যাগস

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Know about Cookies
Ok, Go it!
To Top