তরুণদের পছন্দের ধুতি

S M Ashraful Azom
সেলাইবিহীন এক খণ্ড কাপড়। এটাই পোশাকের আদি রূপ। লজ্জা নিবারণের প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহারের কাল পেরিয়ে মানুষ ক্রমেই সভ্য হয়েছে। এ সময় সভ্য মানুষের আবরণ ছিল সেলাইবিহীন কাপড়। আর তা পরা হতো গায়ে জড়িয়ে বা পেঁচিয়ে। আধুনিক ফ্যাশনের ভাষায় সেটাই ড্রপিং। এর পরিধানরীতি দেশভেদে বিচিত্র। নানা দেশের স্কাল্পচার ও পেইন্টিংয়ে চোখ রাখলেই সেটাই স্পষ্ট হয়ে উঠে। গ্রিক, রোমান সভ্যতায় চোখ ফেরালে তা আরও বোঝা যায়। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেলাইবিহীন পোশাক হারিয়ে গেলেও টিকে আছে ধুতি। এর বিভিন্ন স্টাইলের দেখা মেলে খ্রিস্টজন্মের দুশ বছর আগে থেকে তিনশ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত, শতবাহন রাজাদের সময়ে।
 
দুর্গার আগমনী বার্তা শরতের বাতাসে বইছে। পূজার আমেজের সঙ্গে বাঙালির জাঁকজমকের অন্ত নেই। ঢাকের বাজনা, উলুধ্বনি আর শঙ্খের সুরে বেজে উঠেছে চারপাশ। সাধারণত ছেলেদের ফ্যাশনের কথা বললেই চোখে ভাসে ন্যারো জিন্স, স্টাইলিশ একটি টি-শার্ট, নয়তো স্যুট। কিন্তু দুর্গাপূজার আমেজ পুরোপুরি পেতে চাইলে ফিরে যেতে হবে সেই ধুতি-পাঞ্জাবির আমলে। পূজার ঐতিহ্যবাহী এ পোশাকটি বর্তমানে বিশেষ স্টাইলে পরিণত হয়েছে। ধুতি প্রসঙ্গে বলা যায়, সেলাইবিহীন এ কাপড়ের খণ্ডটি সভ্যতার শুরুর পোশাক। সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা এই যে, সময়ের হাজারো রদবদলেও এর অস্তিত্ব আজও টিকে আছে। যে পোশাকটি একসময় অফিস-আদালতে ফরমাল পোশাক হিসেবে পরিচিত ছিল, আজ তা ফ্যাশন বলি আর ব্যস্ত জীবন বলি—সবকিছুর অন্তরালে চলে যাচ্ছে। এখন তা শুধু দেখা যায় পণ্ডিত বা পূজারিদের পরনে। অথচ একসময় হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সবাই ধুতি পরেছেন।
 
আমাদের এই উপমহাদেশে ধুতি মূলত সুরপাড়ের প্রান্তে রেখাভিত্তিক আঁচল। তবে সময়ের সঙ্গে এর আঙ্গিকেও পরিবর্তন এসেছে। এখানে লেগেছে ডিজাইনারদের ছোঁয়া। যেকোনো পোশাকেই কয়েকটি স্তর থাকে। কাজের ধরন অনুযায়ী একটা শ্রেণিভেদ যেমন থাকে, তেমনি সামাজিক অবস্থান অনুযায়ীও থাকে স্তরভেদ। কাজের ধরনের মধ্যে অফিসিয়াল, ক্যাজুয়াল আর অনুষ্ঠানধর্মী। পরার ধরনেও এর তারতম্য থাকে। অন্যদিকে সামাজিক যে তারতম্য, সেখানেও কাপড়ের মান ও রং মুখ্য হয়ে উঠে। সূচনায় খদ্দরের ধুতিই ছিল; আবার এর পাশাপাশি সিল্ক, তসর এমনকি পলিয়েস্টার ধুতিও বাজারে এসেছে।
 
সময়ের বিবর্তন বা ফ্যাশনের মারপ্যাঁচ যা-ই বলি না কেন, ধুতির স্টাইলে এসেছে নানা ধরনের পরিবর্তন। তবে একেক জায়গায় ধুতি পরার ধরনও একেক রকম। ধুতির রঙেও এসেছে পরিবর্তন। ধুতির রং এখন আর শুধু সাদার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এখন প্রায় সব রঙেরই ধুতি পাওয়া যায়, আর সঙ্গে রয়েছে নানা ডিজাইনের পাড়। আগেকার দিনে ধুতি ছিল শাড়ির মতো; কিন্তু বর্তমানে ইলাস্টিক দেওয়া রেডিমেইড ধুতির আবির্ভাব হয়েছে। যা পরতে না আছে কষ্ট, না আছে খুলে যাওয়ার ভয়। এখন আসি পাঞ্জাবি প্রসঙ্গে, যা ধুতির সেই আদি সঙ্গী হিসেবে পরিচিত। ধুতির মতো পাঞ্জাবির রঙঢঙে আর কাটছাঁটে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। পাঞ্জাবির কথা এলে প্রথমেই মাথায় আসে কাপড়ের কথা। আজকাল বিভিন্ন ডিজাইনের বিভিন্ন ধরনের কাপড়ের পাঞ্জাবির চাহিদা বাজারে বহুগুণ বেড়ে গেছে। ধুপিয়ান, অ্যান্ডি কটন, জয়সিল্ক, কটন, কাতান কাপড়ের ছড়াছড়ি রয়েছে পাঞ্জাবির বাজারে। এসব পাঞ্জাবিতে মেশিন এমব্রয়ডারি, প্যাঁচওয়াক, কারচুপি, স্কিনপ্রিন্ট হ্যান্ড এমব্রয়ডারি, মাল্টি কালার স্কিনপ্রিন্ট, ব্লক, সিকুনের কাজসহ নানা ধরনের পাড় বা লেস রয়েছে। এবার আসি রঙের কথায়, ধুতির মতো পাঞ্জাবির রঙেও রয়েছে বিবর্তনের ছোঁয়া। ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত চাইলেই আলাদা আলাদা রঙের বৈচিত্র্যে পাঞ্জাবিতে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিতে পারেন। আর ডিজাইনের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসাটাই স্বাভাবিক। এবার আসি ধুতি আর পাঞ্জাবির রঙের কম্বিনেশনে। পাঞ্জাবি যে রঙের হবে ধুতি তার বিপরীত রঙের পরাটাই ভালো। আমাদের দেশীয় ফ্যাশন হাউসগুলো ব্যস্ত পূজার আয়োজন নিয়ে। পুরোনো ঢঙ ও আধুনিকতার ছোঁয়ায় স্টাইল স্টেটমেন্ট হিসেবে ধুতি-পাঞ্জাবি এবারের পূজার ট্রেন্ড। হিন্দু সংস্কৃতির মানুষের জন্য শারদীয় দুর্গাপূজা সবচেয়ে বড় উত্সব। দুর্গাপূজার মণ্ডপগুলো সব বাঙালির কাছে এক মহামিলনমেলায় পরিণত হয়। বাঙালিদের এ উত্সব আয়োজনে বাঙালিয়ানা সাজই হতে পারে বাঙালির ট্রেন্ড। এক্ষেত্রে ধুতি-পাঞ্জাবিই এবারের পূজায় ছেলেদের ফ্যাশন। বিভিন্ন ফ্যাশন হাউস নানা ডিজাইনের ধুতি-পাঞ্জাবি নিয়ে এসেছে। যার ধরন বুঝে দাম একেক রকম হবে। বিভিন্ন সাইজের ফতুয়া, শর্ট পাঞ্জাবি, লং পাঞ্জাবি, বডি ফিটিংস পাঞ্জাবির সঙ্গে নানা স্টাইলে ধুতি পরা সম্ভব।
 
ট্যাগস

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Know about Cookies
Ok, Go it!
To Top