সিলেটে বোমা মেশিনে নষ্ট হচ্ছে পরিবেশ

S M Ashraful Azom
শুষ্ক মৌসুম শুরুর সঙ্গে সঙ্গে অপরিকল্পিতভাবে সিলেটের বিভিন্ন বালি-পাথর মহাল থেকে পাথর উত্তোলন ও বিক্রি শুরু হয়েছে। ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে থাকা সিলেটের পাহাড়-টিলা এমনকি নদীর তলদেশ থেকেও পাথর উত্তোলন করায় ভূ-প্রকৃতি ক্রমাগত দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। এভাবে পাথর উত্তোলনে পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাছাড়া ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে মনোরম পর্যটন স্পটগুলো।
 
ভূমিকম্প প্রবণ এলাকা হিসাবে চিহ্নিত সিলেটে প্রকৃতিক সম্পদ আহরণ ও উঁচু ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের কথা বলে আসছেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু পাথর ব্যবসায়ীরা এসব  বিষয়কে পাত্তা দেয় না। তারা সরকারকে নামমাত্র শুল্ক দিয়ে যেমন খুশি তেমনভাবে পাথর উত্তোলন করছে।
 
বিশেষ করে ভোলাগঞ্জ, জাফলং এবং সুনামগঞ্জের ধোপাজান, ফাজিলপুরের বালি-পাথর মহালসহ বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় মাটির গভীর থেকে, পাহাড় কেটে, নদীর তীর ধসিয়ে অপরিকল্পিতভাবে পাথর আহরণ চলছে। গত কয়েক দশক ধরে পাথর আহরণ চলতে থাকায় অনেক স্থানে সবুজ-প্রকৃতি হারিয়ে গেছে। সংকট তরান্বিত করছে পাথর উত্তোলনে ব্যবহূত অবৈধ ‘বোমা মেশিন’। এই মেশিন দিয়ে   নদীর গহীন থেকেও পাথর তোলা যায়। তাতে নদীর তলদেশসহ ভূ-প্রকৃতির গঠন ক্রমাগতভাবে দুর্বল হচ্ছে। ফলে সিলেট অঞ্চলে প্রাকৃতিক বিপর্যয় হলে তার তীব্রতা হবে অনেক বেশি - এমনি আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।
 
সীমান্তবর্তী কোম্পানীগঞ্জ, জাফলং, লালাখাল পর্যটন সমৃদ্ধ এলাকা। এ ছাড়া এলাকাগুলো প্রকৃতিক সম্পদেও ভরপুর। কিন্তু অপরিকল্পিত বালি-পাথর আহরণের ফলে এসব এলাকার সম্পদ ও সম্ভাবনা হারিয়ে যেতে বসছে। পরিবেশ অধিদপ্তর মাঝে মধ্যে যখন অভিযান চালায় তখন পাথর খেকোরা কিছু দিন চুপচাপ থাকে। ক‘দিন পর আবার তারা সক্রিয় হয়ে যায়। বলা বাহুল্য এর পেছনে রয়েছে এক শ্রেণির দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মকর্তা, রাজনৈতিক চক্র।
 
৬টি বোমা মেশিন পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে:
 
রবিবার দুপুরে ভোলাগঞ্জ কোয়ারি এলাকায় টাস্কফোর্স অভিযান চালিয়ে ৬টি বোমা মেশিন আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আলমগীর কবির এর নেতৃত্বে বিজিবি ও পুলিশ সদস্যদের নিয়ে গঠিত টাস্কফোর্স এই অভিযান চালায়।
 
দৃশ্যপট ভোলাগঞ্জ:
 
সিলেটের ভোলাগঞ্জ দেশের সর্ববৃহত্ পাথর কোয়ারি। চারপাশে নয়নাভিরাম দৃশ্য। পর্যটনের অপার সম্ভাবনাময় একটি স্থান। কিন্তু সব হারিয়ে যাচ্ছে পাথর খেকোদের কারণে। হাজার হাজার নর-নারী প্রতিদিন পাথর তোলার জন্য মাটির ৬০-৭০ ফুট নিচে নামে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। তস্করের ন্যায় মাটির গভীর থেকে পাথর ওঠায়। দেড় যুগ আগেও কোম্পানিগঞ্জে বহমান নদী, পাহাড়, ঝর্ণা, নয়ন জুড়ানো ফসলি জমি ছিল। ছিল কমলালেবুর মনোহর বাগ। বন্য প্রাণীরা ঘুরতো মনের আনন্দে। ধলাই-পিয়ান পাহাড়ি নদীর স্ফটিক স্বচ্ছ পানিতে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের বিচরণ ছিল। এখন  সেখানে প্রকৃতি রুক্ষ হয়ে উঠেছে। নদীতো নয়-যেন খণ্ড খণ্ড মরা জলাশয়। এলাকাটি ক্ষত-বিক্ষত হয়ে পড়েছে। সিলেটের উজানে বন-বৃক্ষ উজাড় হয়ে পাহাড়গুলো উদাম হচ্ছে। আর বর্ষায় এসব পাহাড় ধুয়ে ভাটির জনপদ বালিতে ভরে যাচ্ছে। ফসলি জমি হচ্ছে মরুভূমি।
 
৮০‘র দশক পর্যন্ত কোয়ারি থেকে স্থানীয় শ্রমিকরা পাথর উত্তোলন করতো বেলচা বা কোদালের সাহায্যে-ডুব সাঁতার দিয়ে এবং নৌকা প্রতি বিক্রয় করতো পাথর। ৯০‘দশকে এক শ্রেণির পাথর ব্যবসায়ী অবৈধ পন্থায় পাথর তুলতে ‘বোমা মেশিন’ নামায়। এই ‘বোমা মেশিনে’র সাহায্যে নদীর গহীন থেকে বিপুল পরিমাণ পাথর উত্তোলন করা গেলেও পরিবেশের জন্য তা মারাত্মক ক্ষতিকর।
 
‘বোমা মেশিন’ বন্ধের নির্দেশ হাইকোর্টের: বোমা মেশিন ব্যবহারে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা আছে। এরপরও এর ব্যবহার থেমে নেই। অভিযোগ রয়েছে, দৈনিক ৫-১০ হাজার টাকা চাঁদার বিনিময়ে একেকটি বোমা মেশিন চলে।

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Know about Cookies
Ok, Go it!
To Top