‘বড় ভাই’ আসলে কে বিভ্রান্তি কাটছে না

S M Ashraful Azom
ইতালীয় নাগরিক চেজার তাভেল্লা হত্যার ঘটনায় গ্রেফতারকৃত সন্দেহভাজন খুনিদের নির্দেশদাতা ‘বড় ভাই’ নিয়ে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। কে আসল বড় ভাই তা নিয়ে রহস্য আরো ঘনীভূত হয়েছে। গত মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বড় ভাই হিসেবে ঢাকা মহানগর বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুমের (কাইয়ুম কমিশনার) নাম বললেও গতকাল তিনি বলেছেন, ওই বিএনপি নেতাকে সন্দেহের তালিকায় রাখা হয়েছে। এছাড়া আরো কয়েকজন সন্দেহের তালিকায় আছেন। অপরদিকে তদন্তকারীরা বলছেন, খুনিরা যাদের বড় ভাই হিসেবে বলেছে তারা আসলে অন্য কেউ। তবে তাদের রাজনৈতিক পরিচয় আছে। ফলে আসল বড় ভাই নিয়ে বিভ্রান্তি থেকেই যাচ্ছে। রিমান্ডে থাকা আসামিরা জানিয়েছে, তাদের যে টাকা দেয়া হয়েছে তা লন্ডন থেকে এসেছে। কে পাঠিয়েছে বা কিভাবে এসেছে সে ব্যাপারে তারা কিছু বলতে পারেনি। লন্ডন থেকে টাকা একজন বিএনপি নেতার কাছেই আসে।
 
এদিকে সিআইডি থেকে চেজার তাভেল্লাকে হত্যায় ব্যবহূত গুলির ব্যালাস্টিক (রাসায়নিক পরীক্ষা) রিপোর্ট ডিবিতে তদন্তকারীদের কাছে পৌঁছেছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বলেন, পয়েন্ট ৩২ বোরের একটি পিস্তল থেকে গুলি করা হয়েছে। পিস্তলটি দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি। তবে পুলিশ এখনো হত্যাকাণ্ডে ব্যবহূত অস্ত্রটি উদ্ধার করতে পারেনি। আদালতে দেয়া রুবেলের স্বীকারোক্তি থেকে জানা যায়, ওই অস্ত্রটি বাড্ডা এলাকার ভাঙ্গারি সোহেলের। ঘটনার আগে সোহেলের কাছ থেকে অস্ত্রটি নিয়ে আসে রুবেল। ঘটনার পর তা ফেরত দিয়ে আসে। সোহেলকেও এখনো গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। ফলে অস্ত্রটি উদ্ধার করা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে তারা।
 
তদন্ত সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বলেন, তাভেল্লা হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা ও নির্দেশনা বিদেশ থেকেই এসেছিল বলে প্রাথমিক তদন্তে জানতে পেরেছেন গোয়েন্দারা। পেশাদার খুনিরা কেবল ওই কিলিংমিশন সম্পন্ন করেছে। তিন থেকে চারটি পর্যায়ের মধ্যে এ হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ হয়েছে। মূল খুনী হিসাবে অভিযুক্ত শুটার রুবেল নেপথ্যের মূল নায়কের সম্পর্কে স্পষ্ট কিছু জানেন না। তিনি খুনের জন্য ভাগ্নে রাসেলের সঙ্গে ৪০ হাজার টাকায় চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন। তবে ভাগ্নে রাসেল নির্দেশ পেয়েছিলেন কথিত ‘বড় ভাই’য়ের কাছ থেকে। এদিকে ভাগ্নে রাসেলও রিমান্ডে হত্যাকাণ্ডে সংশ্লিষ্টতা ও শুটার রুবেলের সঙ্গে চুক্তির বিষয়ে স্বীকার করেছে বলে জানিয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
 
তদন্ত সংশ্লিষ্ট অপর এক কর্মকর্তা বলেন, ভাগ্নে রাসেল তো একবার বলেছে, বিষয়টি ধামাচাপা দিতে রুবেলকেই হত্যার পরিকল্পনা ছিল তাদের। যদিও এই তথ্যের কোনো সত্যতা মেলেনি। এছাড়া সে আরো জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের টাকা লন্ডন থেকে আসে বিএনপি সমর্থিত একজন ব্যবসায়ীর কাছে। কিন্তু বিএনপির কোন কোন নেতা এতে জড়িত সে ব্যাপারে তারা পরিষ্কার করে কোনো তথ্য দিতে পারেননি। 
 
গত মঙ্গলবার রাত থেকে বুধবার পর্যন্ত বিভিন্ন গণমাধ্যমে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বরাত দিয়ে তাভেল্লা খুনে নির্দেশদাতা সেই ‘বড়ভাই’ হিসেবে কাইয়ুমের নাম প্রকাশ হয়েছে। তবে গতকাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার সেই কথা থেকে আবার কিছুটা সরে এসেছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের পর একাধিক গণমাধ্যমকে বিদেশে অবস্থান করা কাইয়ুম বলেছেন, সরকার তাকে বলির পাঁঠা বানাতে চায়। বিএনপির মুখপাত্র ড. আসাদুজ্জামান রিপনও বলেছেন, কাইয়ুম কমিশনার জড়িত বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যে দাবি করেছেন তা ‘আজগুবি’। এটা ব্লেম গেম। এদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মুখপাত্র মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেছেন, বিদেশি হত্যার নির্দেশ লন্ডন থেকে এসেছে।
 
তাভেল্লা হত্যা মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা ও ঢাকা মহনগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মাহফুজুল ইসলাম বলেন, রুবেল আদালতে যে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন তার সঙ্গে জিজ্ঞাসাবাদে ভাগ্নে রাসেলের কিছু কিছু কথার মিল পাওয়া গেছে। ভাগ্নে রাসেল রুবেলের কাছ থেকে ইয়াবা বিক্রির ৪০ হাজার টাকা পেতেন। ভাগ্নে রাসেল সেই টাকা মওকুফের কথা বলে বিনিময়ে ওই বিদেশিকে গুলি করায়। তবে ভাগ্নে রাসেল কার কাছ থেকে নির্দেশনা পেয়েছেন সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট মুখ খোলেননি।
 
তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বিএনপির মধ্যম ও শীর্ষ সারির অন্তত চারজন নেতাকে তারা সন্দেহের তালিকায় রেখেছেন। ওই নেতাদের ফোনের কল লিস্ট ও ফোনালাপ পরীক্ষা চলছে। এ ছাড়া সেই নেতাদের অনুসারী এবং গ্রেফতারকৃত চারজনের ফোনের কললিস্টও পরীক্ষা করা হচ্ছে। তবে এরই মধ্যে নানা রকম তদন্তে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্যপ্রমাণও মিলেছে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, কথিত বড়ভাইয়ের পেছনেও আরো কেউ রয়েছে। এছাড়া রংপুরে নিহত জাপানের নাগরিক কুনিয়ো হোশি হত্যাকাণ্ডটিও একই কারণে ঘটানো হয়েছে। কুনিয়ো হত্যা ও গুলশানে নিহত তাভেল্লা খুনের বিষয়টি একই সূত্রে গাঁথা।
ট্যাগস

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Know about Cookies
Ok, Go it!
To Top