দিনমজুর পিতা মনু মিয়া ও তার স্ত্রী হারিয়ে যাওয়া আদরের সন্তান মজিবুর রহমানের (১৫) লাশটি পেয়ে হাউ-মাউ করে কেঁদে উঠলেন। অনেকটা পরিচয়বিহীন ভাবে ৮ দিন আগে ভারতের মাটিতে মারা যাওয়া তাদের এই কিশোর ছেলেকে ফিরে পাওয়ার আশা তারা ছেড়েই দিয়েছিলেন। তারা জানতেনও না ছেলেটি মারা গেছে। অবশেষে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবির কর্মকর্তাদের সহায়তায় জীবিত না হলেও ছেলের মৃতদেহ ফিরে পেলেন।
কিশোরগঞ্জ জেলার ভাটি এলাকা ইটনা উপজেলার পূর্বগ্রামের দরিদ্র এই পিতা-মাতা বললেন, ‘ছেলেটি মারা গেছে, হায়াত নেই। কিন্তু লাশটি ফিরে পেয়েছি, তাতেই আমরা খুশী।’
বুধবার জকিগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে মজিবুরের লাশ গ্রহণ করা হয়। গত ২১ অক্টোবর আসামের শিলচর হাসপাতালে অসুস্থ অবস্থায় ছেলেটির মৃত্যু ঘটে। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, বছর তিনেক আগে বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে শরীরে জড়িয়ে গেলে মজিবুরের একটি হাতের প্রায় গোড়ার দিকে এবং অপরটি কনুইয়ের কাছে কেটে ফেলতে হয়। প্রায় বছর খানেক চিকিত্সার পর তার শারীরিক স্বাভাবিকতা মোটামুটিভাবে ফিরে আসলেও মানসিক কিছু অসংলগ্নতা রয়েই যায়। এক পর্যায়ে ছেলেটি কিভাবে যেন সিলেট সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে চলে যায়। পরে করিমগঞ্জ জেলা পুলিশ তাকে আটক করে শিলচরের সেফ হোমে পাঠায়। সেখানে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে ভর্তি করা হয় শিলচর হাসপাতালে। শিশুটি সেখানেই চিকিত্সাধীন অবস্থায় মারা যায়।
যে ভাবে নিশ্চিত হলো পরিচয়: ৪১ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল শাহ আলম চৌধুরী ভারতে বাংলাদেশি এক শিশুর মৃত্যু সংবাদ বিএসএফ এর মাধ্যমে জানতে পারেন। পরে বিজিবি মৃতদেহটি দেশে নিয়ে আসার আগ্রহ দেখায়। কিন্তু বিএসএফ প্রদত্ত ঠিকানায় কিছুটা গড়মিল থাকায় তার সঠিক পরিচয় নিশ্চিত হতে সময় লাগে। অবশেষে শাহ আলম চৌধুরী ভারতের মেঘালয়ে অবস্থানরত কানাইঘাটের এক ব্যবসায়ীকে শিলচর হাসপাতালে পাঠিয়ে নিশ্চিত হন যে মৃতদেহটি ইটনা উপজেলার হারিয়ে যাওয়া সেই কিশোরের। তিনি মুজিবরের পরিবারকে খবর পাঠান। কিন্তু দরিদ্র পিতা-মাতার ইটনা থেকে জকিগঞ্জে এসে ছেলের পরিচয় নিশ্চিত হয়ে লাশ নিয়ে আবার বাড়ি ফেরার আর্থিক সামর্থ্য ছিল না। এরই মধ্যে বিষয়টি বিজিবি’র মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমদ অবহিত হন। তিনি দ্রুত ছেলেটিকে তার পিতা-মাতার কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা নিতে ৪১ বিজিবি অধিনায়ককে নির্দেশ দেন। নানা আনুষ্ঠানিকতা শেষে অবশেষে জকিগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে মৃতদেহটি পিতা-মাতার কাছে হস্তান্তর করা হলে তারা লাশ নিয়ে বাড়ি চলে যান।
এ প্রসঙ্গে ৪১ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল শাহ আলম চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, বিজিবি সীমান্তে অপারাধ দমনে সদাসতর্ক। তবে তাদের মানবিকতাকে খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। তিনি এ ব্যাপারে সহায়তার জন্য বিজিবি’র মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্টদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

