নিহত দীপনের বাবা আবুল কাসেম ফজলুল হককে হত্যার হুমকি

Nuruzzaman Khan
সেবা ডেস্ক : প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপনকে জবাই করে হত্যার পর এবার তার বাবা অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হককে টেলিফেোনে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে।

বুধবার দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের এ সাবেক সভাপতিকে টেলিফোনে হুমকি দেওয়ার ঘটনা ঘটে।

খবর পেয়ে গণমাধ্যমকর্মীরা অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের পরিবাগের বাসায় ভিড় করেন। এ সময় হুমকির ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি এ ব্যাপারে কিছুই বলবো না। বেশ কিছু দিন ধরেই আমি নানা রকম ফোন পাচ্ছি।”

এরপরই সদ্য ছেলহারা বাবা অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক জানান হুমকি পাওয়ার পর তিনি ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছেন।

তিনি বলেন, “এমন একটি তরতাজা ছেলে খুন হওয়ার পর আমি নিজেকে নিয়ে ভাবছি না। তবে আজ থেকে আমি একেবারেই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। যখন তখন আমাকে মেরে ফেলা হতে পারে।”

মুক্তিযোদ্ধা এ শিক্ষক বলেন, “১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন ৯ মাসের মতো অনিরাপদ বোধ করছি”।

তিনি বলেন, “ মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসের সময়  যেমন ভয় পেয়েছি তেমন ভয় পাচ্ছি, ১৯৭২ সালের পর থেকে এমন ভয় আর কোনো দিনই আমি পাইনি।”

টেলিফোনে হুমকির ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জিজ্ঞেস করলে চার দশকের শিক্ষকতা জীবন শেষে অবসর জীবনে থাকা আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন, “পুলিশের কাছে গিয়ে কী হবে?”

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে ২৫ মার্চ রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলে পড়েছিল পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সদস্যরা। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘুমন্ত শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের নির্বিচারে হত্যা করে।

মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস ধরে নিপীড়ন চললেও মুক্তিযুদ্ধের শেষলঘ্নে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ঢাকায় অবস্থানরত বুদ্ধিজীবী-সাংবাদিক-লেখকদের ১২-১৫ ডিসেম্বর রাত পর্যন্ত বাসা থেকে চোখ বেধে তুলে নিয়ে হত্যা করে পাকিস্তানী সেনারা।

ওই সময়ে হত্যাকাণ্ড থেকে বেঁচে যাওয়া বাংলাদেশে বুদ্ধিজীবীদের অন্যতম আবুল কাসেম কাসেম ফজলুল হক। নিরপেক্ষ রাজনীতি চিন্তা ও তত্ত্বের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত এই শিক্ষক একজন মনীষী। তিনি একজন প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক ও রাষ্ট্রচিন্তাবিদ।

তিনি ছাত্র জীবনে বর্তমান বেসামরিক বিমান ও পযর্টনমন্ত্রী রাশেদ খান মেননের সঙ্গে ছাত্র ইউনিয়ন করতেন। পরবর্তীতে তিনি শহীদ কমরেড সিরাজ সিকদারের সঙ্গে সর্বহারা পার্টি গঠন করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাজনীতিতে বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের ‘সাদাদল’ প্রতিষ্ঠায়ও ভূমিকা রাখেন।

আবুল কাসেম ফজলুল হক সমাজতন্ত্রের অনুসারী হলেও অন্যদের মতো ইসলাম বিদ্বেষী নন। তিনি মনে করেন ধর্ম ও ধর্মবিশ্বাসী মানুষদের নিয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা মানে সমাজ প্রগতির বিরুদ্ধে মৌলবাদীদের উসকে দেয়া। তার মতে, যেহেতু দেশের অধিকাংশ সাধারণ মানুষই ধর্মানুগত, তাই তাদের বিশ্বাসে সরাসরি আঘাত দিলে তাদের কাছে নিজের গ্রহণযোগ্যতা হারাতে হয়, সমাজ পরিবর্তনের কাজ হয় বিঘ্নিত।

কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ার মুহাম্মদ আবদুল হাকিম ও জাহানারা খাতুন দম্পতির ছেলে আবুল কাসেম ফজলুল হক। স্ত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ফরিদা প্রধান। তিনি জাতীয় গণতান্ত্রিক দলের প্রতিষ্ঠাতা শফিউল আলম প্রধানের আপন বোন। হক ও ফরিদা দম্পতির ছেলে জাগৃতি প্রকাশনীর সত্ত্বাধিকারী ফয়সাল আরেফিন দীপন ও মেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষক সুচিতা শারমিন।

গত শনিবার বিকালে শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটের তৃতীয় তলায় জাগৃতি প্রকাশনীর কার্যালয়ে দীপনকে জবাই করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। হামলার পর আল কায়েদার নামে বিবৃতি দিয়ে দাবি করা হয়েছে দীপনকে নাস্তিক হিসেবে হত্যা করা হয়েছে
তবে দীপন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে জানিয়েছেন খোদ বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তিনি বলেন, ‘নিহত ফয়সাল আরেফিন দীপন জিয়া স্মতি পাঠাগারের সহসভাপতি ছিলেন এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শে উজ্জীবিত একজন নিবেদিত সংগঠক ছিলেন।’

অন্যদিকে জনপ্রিয় টকশো উপস্থাপক আবদুন নুর তুষার জানিয়েছেন, নিহত দীপন নিয়মিত নামাজ পড়তো ও রমজান মাসে রোজা রাখতেন। তুষার দীপনের ইসলাম চর্চার প্রত্যক্ষদর্শী বলেও দাবি করেন।

একমাত্র ছেলে খুন হয়ে যাওয়ার পর আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন, ‘আমি কোনো বিচার চাই না। আমি চাই শুভবুদ্ধির উদয় হোক। যারা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ নিয়ে রাজনীতি করছেন, যাঁরা রাষ্ট্রধর্ম নিয়ে রাজনীতি করছেন, উভয় পক্ষ দেশের সর্বনাশ করছেন। উভয় পক্ষের শুভ বুদ্ধির উদয় হোক। এটুকুই আমার কামনা। জেল-ফাঁসি দিয়ে কী হবে।’

দীপনের বাবার এই কথা সূত্র ধরে রবিবার তাকে বর্বরোচিত আক্রমণ করেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ।

হানিফের দাবি, খুনীরা যে রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী দীপনের বাবাও একই মতাদর্শে বিশ্বাসী হওয়ায় তিনি ছেলে হত্যার বিচার চান না।

পরে দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনার মুখে হানিফ তার মন্তব্য প্রত্যাহার করে সাংবাদিকদের মাধ্যমে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন।

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Know about Cookies
Ok, Go it!
To Top