বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সঙ্কটে অন্যান্য মুদ্রার তুলনায় ডলারের দাম কমলেও বাংলাদেশে ব্যতিক্রম। বাংলাদেশে বরং ডলারের বিপরীতে টাকার মান কিছুটা বাড়ানো সম্ভব হলেও তা রফতানিকারকদের স্বার্থে নমনীয় রাখা হয়। রফতানির জন্য কিছুটা প্রণোদনা হিসাবেও এটিকে দেখা হয়। কিন্তু এতে আমদানি করতে গিয়ে বাড়তি ব্যয় যেমন হয়, তেমনি পণ্যের মূল্য বৃদ্ধিতেও এটি সহায়ক। ফলে বাংলাদেশে মুদ্রার প্রকৃতই কার্যকর বিনিময় হার চালু কার্যত সম্ভব হচ্ছে না।
ব্যাংকিং সূত্রমতে, টাকা ও ডলারের মূল্যমান কিছুটা স্থিতিশীল থাকলেও গত কয়েকমাস ধরে ডলারের দাম বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এটি অব্যাহত থাকলে পণ্যমূল্য বৃদ্ধির যে চাপ সৃষ্টি হবে দেশের অর্থনীতিতে, সাধারণ মানুষকে বেশি দামে পণ্য কিনতে হলে তাদের আয়ের ওপর যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, তার সামাল দেয়ার মত বিকল্প কোনো সুযোগও আপাতত লক্ষণীয় নয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা গেছে, প্রতিদিনই বাড়ছে মার্কিন ডলারের দাম। এতে অবমূল্যায়ন হচ্ছে টাকার। এক মাসের ব্যবধানে ডলারের বিপরীতে ১ দশমিক ৪১ শতাংশ দর হারিয়েছে টাকা। গতকাল মঙ্গলবার আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে ১ মার্কিন ডলারের জন্য ৭৮ টাকা ৯০ পয়সা খরচ করতে হয়েছে। ১ মাস আগেও ১ ডলারের জন্য খরচ করতে হয়েছে ৭৭ টাকা ৮০ পয়সা। ফলে ১ মাসে ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমেছে প্রায় ১ টাকা ১০ পয়সা। কার্ব মার্কেটে ডলারের দাম আরো বেশি। এখানে প্রতি ডলার পেতে খরচ হয় ৮০ টাকার ওপরে। সাধারণত ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন হলে বৈদেশিক মুদ্রা আয়কারী রফতানিকারক ও রেমিট্যান্স প্রেরণকারীরা উত্সাহিত হন। কারণ এতে আগের চেয়ে ডলারের বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রা বেশি পান তারা। তবে ডলারের দাম বাড়লে আমদানিকারকরা নিরুত্সাহিত হন। কারণ আমদানি ব্যয় মেটানোর জন্য তাদের তখন বেশি টাকা ব্যয়ে ডলার কিনতে হয়। এতে দেশিয় বাজারে আমদানিকৃত পণ্যের মূল্য বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। যা থেকে সার্বিক দ্রব্যমূল্যই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় চলে আসে।
এসব বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশি টাকার বিনিময় মূল্য অনেকটাই স্থির ছিল। এখন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে থাকায় টাকার অবমূল্যায়ন করা হতে পারে। যাতে রফতানিকারক ও রেমিটাররা উত্সাহিত হন। তবে ডলারের বিপরীতে যাতে টাকার অবমূল্যায়ন অনেক বেশি না হয় সেদিকে নজর রাখতে হবে। কারণ টাকার বেশি অবমূল্যায়ন হলে মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উঠতে পারে।
ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে সাম্প্রতিক সময়ে ডলার প্রাপ্তির উত্সগুলোর মধ্যে বিদেশি বিনিয়োগ, বৈদেশিক ঋণ সহায়তা, রেমিটেন্স ও রফতানি আয়ের কোনোটাই ঊর্ধ্বমুখী নয়। বিনিয়োগের কথা যদি বলা হয়, তা নির্ভর করে সামষ্টিক অর্থনীতির ব্যবস্থাপনা ও বৈশ্বিক অর্থনীতির গতি-প্রকৃতির ওপর। কিন্তু বর্তমানে সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা এবং অর্থনীতির ঝুঁকিগুলো বহুলাংশে বিদ্যমান। এসব ঝুঁকি কমাতে না পারলে বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগে উত্সাহিত হবে না। আর সেটি যদি না হয়, তাহলে মূলধন পাচার হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেবে। অতীতেও এটি হয়েছে। তাতে টাকার মূল্য আরেক ধাপ অবমূল্যায়ন হবে। কারণ বিনিয়োগ করতে না পারলে উদ্যোক্তারা টাকা ডলারে রাখার জন্য বাইরে পাচার করে দেবে। ইউএনডিপি ও আংকটাডের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, এভাবে বাংলাদেশ থেকে ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার বাইরে চলে গেছে। যা আমাদের বৈদেশিক সাহায্যের প্রায় সমপরিমাণ।

