চট্টগ্রামে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে ছাত্রলীগ-যুবলীগ নামধারী দুর্বৃত্তরা। দুইদিনের ব্যবধানে নগরীর সিআরবি এলাকা, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) ছাত্রলীগ ও যুবলীগ কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে তিনটি সংঘর্ষ হয়েছে। এছাড়া গত কয়েকদিন নগরীতে দোকান দখল ও ভাংচুর এবং শিক্ষক ও ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের ঘটনায় ছাত্রলীগের নাম এসেছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নিয়ন্ত্রিত শাহ জালাল ও শাহ আমানত হলে অভিযান চালিয়ে দুইটি শটগান ও একটি পিস্তলসহ বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধার করেছে পুলিশ। ছাত্রলীগের দুই গ্রুপে সংঘর্ষের জেরে চুয়েট অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সংঘর্ষের বিভিন্ন ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা হলেও এতে মূল হোতাদের আসামি করা হয়নি। সিআরবির ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় ৫৪ জনকে আসামি করা হলেও এ পর্যন্ত গ্রেফতার হয়েছে মাত্র একজন।
সংগঠন দুইটির সাবেক নেতারা জানান, মূলত নেতৃত্বের সংকটের কারণেই ঐতিহ্যবাহী এ সংগঠন দুইটিতে অস্থিরতা ও টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে। তারা বলেন, স্থানীয় নেতৃত্বের অদূরদর্শিতা, আধিপত্য বিস্তারসহ নানা ইস্যুতে নেতাদের মধ্যে বিরোধ দেখা দিয়েছে। এর সাথে ব্যাপকভাবে যুক্ত হয়েছে ব্যবসায়িক স্বার্থ। উভয় সংগঠনের অনেক নেতা-কর্মী ব্যবসা-বাণিজ্যে জড়িত আছেন। ব্যবসায়িক বিরোধ রাজনৈতিক বিরোধের আকার ধারণ করছে।
সিআরবিতে একের পর এক সহিংস ঘটনার মূলে রয়েছে পূর্বাঞ্চলীয় রেলের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ। রেলের এক শ্রেণির কর্মকর্তা এই বিরোধে মদদ দিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে সিআরবি এলাকায় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের দুই গ্রুপে গোলাগুলির ঘটনায় দুইজন নিহত হয়। এর জের ধরে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতা সাইফুল আলম লিমনকে বহিষ্কার করা হলেও মামলার তদন্তে অস্বাভাবিক ধীরগতির কারণে ছাত্রলীগের সাইনবোর্ড ব্যবহার করে দুর্বৃত্তরা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। নানা ইস্যুতে ছাত্রলীগ-যুবলীগ নেতা-কর্মীরা কোন্দলে জড়িয়ে পড়ছেন। বিভিন্ন এলাকায় ছাত্রলীগ নামধারীদের নীরব চাঁদাবাজির কারণে নগরবাসী অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের একাধিক গ্রুপের মধ্যে বিভিন্ন সময় সংঘর্ষ হয়েছে। গত ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী দিবসে এমন এক সংঘর্ষে মারা যান তাপস নামে এক ছাত্র। চবিতে ছাত্রলীগের মহিউদ্দিন চৌধুরী অনুসারী গ্রুপ তাপসকে তাদের কর্মী বলে দাবি করে। চবিতে ছাত্রলীগের নতুন কমিটি গঠিত হয়েছে গত জুলাই মাসে। ক্যাম্পাসে ঠিকাদারি ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ছাত্রলীগের আগের কমিটির মধ্যে প্রায়ই সংঘর্ষ হতো। নতুন কমিটি গঠিত হওয়ার পরও চবিতে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই থামানো যাচ্ছে না। জানা গেছে, চবিতে ছাত্রলীগের বর্তমান সভাপতি মো. আলমগীর টিপু সিটি মেয়র আ.জ.ম নাছির উদ্দিনের অনুসারী এবং সাধারণ সম্পাদক ফজলে রাব্বি সুজন মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারী। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত চবিতে বিভিন্ন সংঘর্ষের ঘটনায় ১৮ জন ছাত্র নিহত হয়েছে বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে, চুয়েটে ছাত্রলীগ বিভক্ত মূলত ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে। বিরোধের একদিকে রয়েছে চুয়েট ছাত্রলীগের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান পাভেল। পাভেলের প্রতিদ্বন্দ্বী যুগ্ম-আহ্বায়ক মুসলেহ উদ্দিন। জানা গেছে, পাভেল ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটনের অনুসারী। অন্যদিকে মুসলেহ উদ্দিন সিটি মেয়র আ.জ.ম নাছিরের অনুসারী। এছাড়া স্থানীয় এমপি এবিএম ফজলে করিমের পিএস সোহেলের সাথে তাকে প্রায়ই দেখা যায়।
পাভেল ও মুসলেহ উদ্দিনের বিরোধকে আঞ্চলিকতার সমস্যা হিসেবেও দেখা হচ্ছে। কারণ পাভেলের বাড়ি অন্য জেলায়। তবে মুসলেহউদ্দিনের বাড়ি চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলা হওয়ায় তাকে স্থানীয়রাও সমর্থন দিয়ে থাকেন। গত সোমবার চুয়েট ক্যাম্পাসে সংঘর্ষের সময় পার্শ্ববর্তী ইমাম গাজ্জালি কলেজ ছাত্রলীগের এক নেতাকে অস্ত্র হাতে মুসলেহউদ্দিনের সমর্থনে দেখা যায় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। চুয়েট ক্যাম্পাসে দুইটি আবাসিক হল ও একটি ভবনের সম্প্রসারিত অংশ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চুয়েট ছাত্রলীগের বিরোধ আরো চরমে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে।
চট্টগ্রামে নেতৃত্বের বিরোধে জড়িয়ে পড়ছে ছাত্রলীগের সাধারণ অনুসারীরা। চাঁদাবাজির ভাগ পাওয়ার আশায় তারা এসব করছেন। ফলে তুচ্ছ ঘটনা অনেক বড় বিরোধে পরিণত হচ্ছে। ছাত্রলীগ-যুবলীগের নাম ব্যবহার করে যেসব অপরাধ সংগঠিত হচ্ছে সেসব ঘটনা তদন্তে পুলিশকে খুব একটা তত্পর দেখা যাচ্ছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে। আইনের আওতায় না আসায় ছাত্রলীগ নামধারীদের ঔদ্ধত্য দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে।
যুবলীগ
একই সমস্যা রয়েছে যুবলীগেও। বর্তমান আহ্বায়ক কমিটির মেয়াদ ছিল ৯০ দিন। সেই আহ্বায়ক কমিটির বয়স ২৮ মাস চলছে। বর্তমান কমিটি নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত। তবে আ.জ.ম নাছির উদ্দিন মেয়র হওয়ার পর থেকে যুবলীগের নেতৃত্ব নিয়ে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। যে কোনো মুহূর্তে নগর যুবলীগের কমিটি ঘোষণা হতে পারে। নতুন কমিটিতে মহিউদ্দিন চৌধুরীর পাশাপাশি আ.জ.ম নাছিরের অনুসারীরা অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ছাত্রলীগ-যুবলীগের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন উভয় সংগঠনের নেতারা। ছাত্রলীগ-যুবলীগ নেতারা তাদের মধ্যে কোনো কোন্দল নেই দাবি করে বলেছেন, সংগঠনের মধ্যে ফাটল ধরাতে স্বাধীনতা বিরোধী চক্র নানা ষড়যন্ত্র করছে।
ছাত্রলীগ চট্টগ্রাম মহানগর সভাপতি ইমরান আহমেদ ইমু বলেন, ‘কোথাও কিছু হলেই ছাত্রলীগের নাম ব্যবহার করা হয়। অথচ যারা এসব করে তাদের আমরা চিনি না, জানি না। গত রবিবার সিআরবিতে সংঘর্ষের ঘটনায় ছাত্রলীগের কেউ জড়িত ছিল না। সংঘর্ষে লিমনের অনুসারীরা জড়িত ছিল বলে পুলিশ দাবি করেছে; কিন্তু লিমন ছাত্রলীগের কেউ নয়। তাকে অনেক আগেই বহিষ্কার করা হয়েছে।’

