আগামী ৩০ ডিসেম্বর দেশের ২৩৪টি পৌরসভায়
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। জাতীয় সংসদে পাস হওয়া আইন
অনুযায়ী এই নির্বাচনে মেয়র প্রার্থীরা প্রথমবারের মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতা
করবেন দলীয় মনোনয়ন ও প্রতীকে। প্রকাশ্যে সমালোচনা করলেও আসন্ন এই পৌরসভা
নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার আগ্রহ রয়েছে বিএনপির। তবে পুলিশসহ
যৌথবাহিনীর ‘বিশেষ অভিযানে’ দেশব্যাপী নেতা-কর্মীদের ধরপাকড় চিন্তায় ফেলে
দিয়েছে দলটিকে। সম্ভাব্য প্রার্থীদের অনেককেই ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করে
কারাগারে নেয়া হয়েছে। গ্রেপ্তার এড়াতে অন্যরা ঘর ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।
যার কারণে প্রার্থী সংকটের মুখে পড়তে যাচ্ছে দলটি। পাশাপাশি এই ধরপাকড়ের
কারণে দলের পুনর্গঠন, কাউন্সিল অনুষ্ঠান এবং দল গুছিয়ে জানুয়ারিতে নতুন করে
সরকারবিরোধী আন্দোলনের যে চিন্তা-ভাবনা ছিল- এর সবকিছুই এলোমেলো হয়ে
পড়েছে। অন্যদিকে, একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দলের সর্বোচ্চ
নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর
ফাঁসির দণ্ড কার্যকর হওয়ায় রাজনৈতিকভাবেও মনস্তাত্ত্বিক চাপে পড়েছে বিএনপি।
দলটির শীর্ষ নেতাদের অনেকেরই ধারণা ছিল, হয়তো শেষ পর্যন্ত সালাহউদ্দিনের
ফাঁসি হবে না। কিন্তু সেই ধারণা ছাপিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ায়
কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছে দলটি। এছাড়া বিএনপিতে ভাঙন ধরাতে দলের
ভেতরে-বাইরে একাধিক পক্ষের নতুন করে তত্পরতাও ভাবিয়ে তুলেছে দলের শীর্ষ
নেতৃত্বকে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে লন্ডনে
অবস্থানের সময় এসব তত্পরতা ‘হঠাত্’ গতি পায়। এখনও পর্দার অন্তরালে প্রায়
প্রতিদিনই এসব তত্পরতার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা নিজেদের মধ্যে ঘরোয়া আলোচনা,
শলা-পরামর্শ করছেন।
বিএনপির
স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য জানান, খালেদা জিয়া লন্ডনে যাওয়ার আগে ১৬
আগস্ট জেলা নেতাদের কেন্দ্র থেকে চিঠি পাঠানো হয়েছিল। তাতে তিন মাসের মধ্যে
জেলার সকল ইউনিটের নতুন কমিটি করার নির্দেশনা দেয়া হয়। কিন্তু ধর-পাকড়ের
কারণে সবকিছু ভেস্তে যেতে বসেছে। তারা জানান, দলের পরিকল্পনা ছিল- তৃণমূল
থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত দল পুনর্গঠন সম্পন্ন করে ডিসেম্বর বা জানুয়ারি নাগাদ
দলের জাতীয় সম্মেলন আয়োজনে উদ্যোগ নেয়া হবে। এই কাজগুলো শেষ করা গেলে নতুন
বছরের প্রথমদিকে সরকারবিরোধী আন্দোলনে যাওয়ারও চিন্তা-ভাবনা ছিল। এদিকে,
বিএনপিকে ভাঙতে একাধিক পক্ষ নতুন করে তত্পর হয়ে উঠেছে। তবে দলের অখণ্ডতা
ধরে রেখে বিএনপির ভিতরে ‘শুদ্ধাভিযান চালানো’র পক্ষেও অবস্থান নিচ্ছেন কেউ
কেউ।
বিএনপি
ও ২০ দলের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানায়, উদ্ভূত সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে
আলোচনা করতে কয়েকদিনের মধ্যেই দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসছেন
খালেদা জিয়া। ২০ দলীয় জোটের নেতাদের সঙ্গেও বসবেন তিনি। এই দুটি বৈঠকে
পৌরসভা নির্বাচন ও আন্দোলন নিয়েও আলোচনা প্রাধান্য পাবে।
বিএনপির
স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ইত্তেফাককে বলেন, তারা আগেই
বলেছেন- পৌরসভা নির্বাচনে সরকারকে খালি মাঠে গোল করার সুযোগ দেবে না
বিএনপি। দলের চেয়ারপারসন দেশে ফেরায় এখন এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া
হবে। দলের মুখপাত্র ড. আসাদুজ্জামান রিপন বলেছেন, পৌরসভা নির্বাচনকে সামনে
রেখে সরকার সারাদেশে বিএনপির নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার করছে।
বিএনপির
পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, বিভিন্ন বাহিনীর যৌথ অভিযানে গত ১৫ দিনে
বিভিন্ন জেলায় ২০ দলের অন্তত দশ হাজার নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এরমধ্যে শুধু বিএনপির নেতা-কর্মী প্রায় ছয় হাজার। তাদের বেশিরভাগের
বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা পরোয়ানা না থাকলেও গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। এতে
সারাদেশে দল-জোটের নেতা-কর্মী-সমর্থকদের মাঝে ভীতি ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
‘আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের’ নামে সরকার কার্যত আসন্ন পৌরসভা
নির্বাচনে বিএনপিসহ ২০ দলকে প্রার্থীশূন্য করার পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই
দেশব্যাপী এই ধর-পাকড় চালাচ্ছে বলে বিএনপি নেতারা অভিযোগ করেন।
বিএনপি
চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেছেন, সুনির্দিষ্ট
অভিযোগ বা মামলা থাকলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী যে কাউকে গ্রেপ্তার বা আটক করতে
পারে। কিন্তু গত কিছুদিন ধরে যাদের ধরা হচ্ছে, তাদের অনেকের বিরুদ্ধেই কোনো
অভিযোগ নেই। শুধুমাত্র পৌরসভা নির্বাচনে যেন বিএনপি প্রার্থী দিতে না পারে
এবং নতুন করে আন্দোলন করতে না পারে, সেজন্যই পাইকারি হারে গ্রেপ্তার করা
হচ্ছে।

