আর মাত্র আট দিনের মধ্যে সারাদেশের ২৩৬টি পৌরসভার মেয়র পদে মনোনয়ন চূড়ান্ত করতে হবে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোকে। মনোনয়নপত্র দাখিলের আগেই রাজনৈতিক দলগুলোকে চূড়ান্ত প্রার্থী মনোনয়ন দিতে হবে। কোনো দল নির্বাচনে মেয়র পদে একাধিক প্রার্থী মনোনয়ন দিতে পারবে না। আগামী ৩ ডিসেম্বরের মধ্যে রাজনৈতিক দলের প্রার্থীকে তা জানাতে হবে রিটার্নিং অফিসারকে। নির্বাচন বিধিমালায় থাকার পরেও গতকাল বুধবার নির্বাচন কমিশন গণমাধ্যমে প্রেরিত বিশেষ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তা আবারো উল্লেখ করেছে।
এদিকে, রাজনৈতিক দলগুলো এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেনি। অধিকাংশ রাজনৈতিক দলই কিভাবে মনোনয়ন দিতে হবে ও এ সংক্রান্ত প্রক্রিয়া কি জানে না। জারিকৃত আইন ও বিধিমালাও এখনো রাজনৈতিক দলগুলোর হাতে পৌঁছায়নি বলে জানা গেছে। পৌর নির্বাচনের মনোনয়ন কাঠামো ঠিক করতে আওয়ামী লীগ আজ সন্ধ্যায় তাদের কার্যনির্বাহী বৈঠক ডেকেছে। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া গত রাতে এ বিষয়ে দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এ প্রসঙ্গে দলের মুখপাত্র ড. আসাদুজ্জামান রিপন ইত্তেফাককে বলেছেন, দুইদিন হয়ে গেল এখনো বিধিমালা পাইনি। এর মধ্য দিয়েই তাদের নীলনকশা প্রকাশ পাচ্ছে।
স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) নির্বাচন বিধিমালা অনুযায়ী নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষমতা যদি কাউকে দেয়, তাহলে আগামী ৩ দিনের মধ্যে ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তির স্বাক্ষর সত্যায়িত করে সংশ্লিষ্ট রিটার্নি অফিসারের কাছে পাঠাতে হবে। কোনো দল থেকে একজনের বেশি মনোনয়ন দেয়া হলে উক্ত দলের প্রার্থিতা বাতিল হয়ে যাবে। যদিও মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের আগ পর্যন্ত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একাধিক ব্যক্তিকে রাজনৈতিক দলগুলো মনোনয়ন দিতে পারতো।
পৌরসভায় দলের সভাপতি/সাধারণ সম্পাদক বা সমমর্যাদার ব্যক্তির মেয়র পদে প্রার্থিতার মনোনয়নপত্রে স্বাক্ষর সত্যায়িত করার প্রয়োজন পড়বে না।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মোবারক ইত্তেফাককে বলেন, শুধু ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে রিটার্নিং অফিসারকে লিখিতভাবে জানাতে হবে। ওই চিঠির অনুলিপি কমিশনকেও দিতে হবে।
আইনে বলা আছে- তফসিল ঘোষণার ৫ দিনের মধ্যে ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি কেউ থাকলে তা জানানোর বিধান। গত মঙ্গলবার ২৩৪টি পৌরসভার তফসিল ঘোষণা করে কমিশন। এর মধ্যে দুই দিন অতিবাহিত হয়েছে। পরে আরো দুইটি পৌরসভা যুক্ত হয়েছে। এগুলো হলো- গাজীপুরের শ্রীপুর ও রাজশাহী পবার নওহাটা পৌরসভা।
গতকাল বিকালে নির্বাচন কমিশন থেকে নিবন্ধিত ৪০টি রাজনৈতিক দলের সাধারণ সম্পাদক/মহাসচিব বরাবর নির্বাচন পরিচালনা ও আচরণ বিধিমালা, পৌরসভা নির্বাচনের তফসিল এবং ২৩৬টি রিটার্নিং অফিসারের তালিকা পাঠিয়েছে। চিঠিতে নিবন্ধিত দল কর্তৃক ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তির তালিকা সরবরাহ করার জন্য অনুরোধ করা হয়। যদিও রাত পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক দল ইসির পাঠানো বিধিমালা পায়নি। পৌরসভার নির্বাচন ও ইসির পাঠানো বিধিমালার বিষয়ে জানতে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য নূহ-উল-আলম লেনিন এবং যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
মনোনয়ন প্রক্রিয়া সম্পর্কিত নির্বাচন কমিশনের বিধিমালা এখনো হাতে পায়নি জাতীয় পার্টি (জাপা)। তবে ইসির বিধিমালা না পেলেও জাপা চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ নিজেই দলের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সাক্ষাত্কার নেয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন। জাপার মনোনয়ন প্রত্যাশীদের আগামী ২৯ নভেম্বর রবিবার সাক্ষাত্কার নেবেন দলের চেয়ারম্যান। ওইদিন সকাল ১০টায় রাজধানীর বনানীতে জাপা চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে এ সাক্ষাত্কার নেয়া হবে। মনোনয়ন প্রত্যাশীদের যথাসময়ে সাক্ষাত্কারে উপস্থিত থাকার জন্য গতকাল দলের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
বিএনপি গতকাল রাত অবধি নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা এবং আচরণ বিধিমালা পায়নি। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আসম হান্নান শাহ বলেন, দলীয় মনোনয়নে আসন্ন পৌরসভা নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে কি না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তাদের তাড়াহুড়া দেখে মনে হচ্ছে কোনো অসত্ উদ্দেশ্য সাধনের মিশন নিয়ে নেমেছে। তারা যে সময় বেঁধে দিয়েছে তা পর্যাপ্ত নয়।
জাতীয় পার্টি (জেপি) মহাসচিব শেখ শহিদুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, কমিশন থেকে কোনো বিধিমালা আমাদের কাছে আসেনি। তবে লোক মারফত তা কমিশন থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। তিনি বলেন, নির্বাচন নিয়ে যাদের পূর্ব প্রস্তুতি নেই, তাদের সমস্যা হবে। ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি কে তা অনলাইনে বা ফ্যাক্সযোগে জানানো যাবে কি না তা কমিশন স্পষ্ট করেনি। তিনি মনোনয়ন জমার সময় আরো বাড়ানোর দাবি জানান।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ইত্তেফাককে বলেন, অবিবেচনাপ্রসূত কাজ করেছে নির্বাচন কমিশন। তফসিল ঘোষণার ৫ দিনের মধ্যে ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি কে জানানোর যে সময় নির্ধারণ করা হয়েছে তা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। নির্বাচনী বিধিমালা সম্পর্কে আমরা এখনো কিছুই জানি না। তা ছাড়া তফসিল ঘোষণার সময় নির্বাচনে টাকার খেলা, পেশিশক্তির ব্যবহার ও প্রশাসনের কারসাজির ব্যাপারে কমিশনের সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেয়নি। এই নির্বাচন সুষ্ঠু হবে সেটা সম্পর্কে আমরা সন্দিহান।
ইসির মাঠ পর্যায়েও পৌঁছায়নি বিধিমালা
তফসিল ঘোষণার দুদিন অতিবাহিত হলেও নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা ও আচরণ বিধি এখনো পৌঁছেনি নির্বাচন কমিশনের মাঠ পর্যায়ে। এ নিয়ে ক্ষোভ জানিয়েছেন অনেক কর্মকর্তা। তবে ইসির কর্মকর্তারা বলছেন, আগামী দু-একদিনের মধ্যে এটা মুদ্রণ শেষে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তাদের হাতে তারা পৌঁছে দেবেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তফসিল ঘোষিত পৌরসভাগুলোতে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কার্যালয়ে মনোনয়নপত্র বুধবার পৌঁছে দেয়া হয়েছে। মঙ্গলবার ও বুধবার সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকার কর্মকর্তারা স্ব স্ব পৌরসভার জন্য ঢাকার বিজিপ্রেস থেকে এ ফরম সংগ্রহ করে মাঠ পর্যায়ে পৌঁছে দেন এবং আগত প্রার্থীদের মধ্যে তা বিতরণ করেন। বুধবার সকাল থেকেই ঢাকা বিভাগে ৬৬, চট্টগ্রাম বিভাগে ৩৭, রাজশাহী বিভাগে ৫০, খুলনা বিভাগে ৩০, বরিশাল বিভাগে ১৭, রংপুর বিভাগে ২০ ও সিলেট বিভাগে ১৬ পৌরসভায় মনোনয়নপত্র বিতরণ শুরু হয়।
পোস্টার অপসারণে এসপিদের চিঠি
আগাম নির্বাচনী প্রচারণা সামগ্রী অপসারণের জন্য পুলিশ সুপারদের চিঠি দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। গতকাল ইসির উপ-সচিব শামছুল ইসলাম স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পোস্টার অপসারণের জন্য সংশ্লিষ্টদের অবগত করা হয়েছে।

