হেমন্তের হালকা শীতের আবহ ছিল। কিন্তু স্যাক্সোফোনের উন্মাতাল সুর উষ্ণতা ছড়ালো শ্রোতার হূদয়ে। গতকাল রাজধানীর বিজয় সরণির সামরিক জাদুঘর মাঠে বসেছে তিন দিনের এ উত্সব। সন্ধ্যা থেকে মাঝরাত অবধি এখানে বয়ে গেল জ্যাজ ও ব্লুজ গানের সুরেলা শব্দধ্বনি। সুরের সেই অপার স্নিগ্ধতায় সিক্ত হলো ঢাকার সঙ্গীতানুরাগীরা। সম্প্রতি জঙ্গি হামলা ও হত্যার অস্থিরতায় আক্রান্ত রাজধানীতে অসুরের বিরুদ্ধে সুরের স্নিগ্ধতা।
পশ্চিমের জনপ্রিয় সঙ্গীতধারা। খুব বড় সঙ্গীতরসিক না হলে এ গানের প্রতি আগ্রহ থাকবার কথা না। কিন্তু উত্সব শুরুর পর বোঝা গেল বাংলাদেশেও এ গানের সমঝদার কম নেই। ‘জ্যাজ’ আর ‘ব্লুজ’ পশ্চিমের সঙ্গীতধারার তিনদিনের উত্সব বসেছে ঢাকায়।
গ্রামীণফোনের পৃষ্ঠপোষকতায় এ আয়োজনের মাধ্যমে দেশে প্রথমবারের মতো আয়োজিত হলো ‘জ্যাজ অ্যান্ড ব্লুজ ফেস্টিভ্যাল ঢাকা ২০১৫’। এর আয়োজক ব্লুজ কমিউনিকেশন্স লিমিটেড । দেশ-বিদেশের খ্যাতনামা শিল্পীদের নিয়ে তিন দিনের এ উত্সব। দর্শকশ্রোতার অধিকাংশই তরুণ-তরুণী। এসেছেন বাংলাদেশে বসবাসরত বিদেশিরাও। বিশাল স্টেজে আলোর ঝলকানিতে জ্যাজ মাস্টারের সুরের মূর্ছনায় ভেসে গেলেন সবাই। একে একে শিল্পীরা মঞ্চে উঠছেন, আর সুরের মূর্ছনায় অভিভূত করছেন দর্শকশ্রোতাদের।
শাস্ত্রীয় সঙ্গীতসহ নানা আঙ্গিকের গান শুনলেও পশ্চিমা জ্যাজ বা ব্লুজ মিউজিকের সঙ্গে অনেক শ্রোতাই পরিচিত নয়। উপমহাদেশের শাস্ত্রীয় ঘরানার গানের সঙ্গে জ্যাজ ও ব্লুজ মিউজিকের কিছুটা সংমিশ্রণ ঘটেছে। শুরুতে আমেরিকা ও পরবর্তী সময়ে আফ্রিকার এই জনপ্রিয় সঙ্গীত আঙ্গিকে যন্ত্রসঙ্গীতের সঙ্গে কণ্ঠসঙ্গীতের অনবদ্য সুর মূর্ছনা সহজেই কড়া নাড়ে শ্রোতার হূদয়ের গভীরে। একইভাবে জ্যাজেরই কিছুটা পরিমার্জিত ধারা হচ্ছে ব্লুজ। আমেরিকা ও ইউরোপের সৃষ্ট এই সঙ্গীত ঘরানাও বিশ্বব্যাপী অনুরণন তুলেছে।
এর আগে ছিল উদ্বোধনের আনুষ্ঠানিকতা। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উত্সব উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী। এতে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইটালির রাষ্ট্রদূত মারিও পালমা, ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূত ওয়ানজা কাম্পোস দ্যা নবরেগা এবং বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আবুল খায়ের। স্বাগত বক্তব্য দেন ব্লুজ কমিউনিকেশন্সের চেয়ারম্যান জিনাত চৌধুরী।
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ভারত, ব্রাজিল ও বাংলাদেশের শিল্পীরা অংশ নিচ্ছেন এই উত্সবে। বৃহস্পতিবার উদ্বোধনী রাতে পরিবেশনায় অংশ নিলেন বাংলাদেশ, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের শিল্পীরা। প্রথম দিনের অন্যতম আকর্ষণ ছিলেন সত্তরের দশক থেকে বিশ্ব্যব্যাপী জ্যাজ সঙ্গীত নিয়ে শ্রোতাকে মোহাবিষ্ট করে রাখা ব্রিটিশ সঙ্গীতশিল্পী জন ম্যাকলাফলিন ও তাঁর দল ফোর্থ ডাইমেনশন। সবার শেষে এই কিংবদন্তি জ্যাজ শিল্পী মঞ্চে এলেও তাঁর গিটারের সুরের অনুরণনেই সবচেয়ে বেশি আলোড়িত হলো আয়োজনটি। জ্যাজের সঙ্গে উপমহাদেশের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সংযোগ ও আধ্যাত্মবাদী চেতনার মিশেল ঘটানো শিল্পীর গিটারের তারের টোকায় ঢাকার রাতে ছড়িয়ে যায় শব্দের মায়াজাল। তাঁর আগে মনমাতানো পরিবেশনা দিয়ে সঙ্গীতপ্রেমীদের মাতিয়ে রাখেন বাংলাদেশের ইমরান আহমেদ কুইনটেট, ভারতের বসুন্ধরা বিদ্যালুর ও যুক্তরাষ্ট্রের সাই মাইস্ট্রো ট্রায়ো।
ইমরানের দলের হূদয়গ্রাহী গিটার বাদনের মাধ্যমে সূচনা হয় সঙ্গীত আসরের। গিটারের স্ট্রিংয়ের কারুকাজে কয়েক মিনিটের পরিবেশনাতেই আদায় করে নেন শ্রোতার করতালি।
উত্সবের দ্বিতীয় দিন আজ শুক্রবার মঞ্চ মাতাবেন বাংলাদেশের রাজেফ খান ও তাঁর ফরাসি বন্ধু ফ্লোরিয়ান এবং দ্য ব্লুজ ব্রাদার্স, ভারতের লুই ব্যাংকস ও যুক্তরাষ্ট্রের কিংবেবি । সমাপনী দিন শনিবার পরিবেশনায় অংশ নেবেন বাংলাদেশের খ্যাতিমান ব্যান্ডশিল্পী আইয়ুব বাচ্চু ও তাঁর দল এবি ব্লুজ। এছাড়া সমাপনী রাতে জ্যাজ ও ব্লুজ মিউজিক পরিবেশন করবেন ব্রাজিলের দল এসড্রাস নোগুইরা কোয়ার্টেট, ভারতের সোলমেট ও ফ্রান্সের খ্যাতিমান জ্যাজশিল্পী চায়না মোজেস। প্রতিদিন সন্ধ্যা ৭টায় শুরু হবে গানের এ উত্সব।
জ্যাজ ধারার সঙ্গীতের শুরু আমেরিকায়, সেখানকার অবহেলিত কালো মানুষ এ ধারার সঙ্গীতের স ষ্টা। আমেরিকায় বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে পিয়ানো বাজিয়ে কালো মানুষরা দুঃখের যে সুর তুলেছিল, ট্রাম্পেট আর ক্লারিনেটে যে সুর উঠেছিল, স্যাক্সোফোনে যে করুণগাথা উঠে এসেছিল তাকেই অনেকে বলেন জ্যাজসঙ্গীত। পরে সারা বিশ্বেই ছড়িয়ে পড়ে এ ধারার সুর।

