
এমপিওভুক্ত বেসরকারি স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসার পাঁচ লাখ শিক্ষক-কর্মচারীদের অষ্টম পে-স্কেলে অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েই গেল। এ ছাড়া সরকারি কলেজের অধ্যাপকদের গ্রেড অবনমন হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের বেতন সিনিয়র সচিবের সমান করার দাবিও উপেক্ষিত হয়েছে নতুন পে-স্কেলে। একইসঙ্গে ক্যাডার, নন-ক্যাডার বেতন বৈষম্য থেকেই যাচ্ছে। আর বার্ষিক প্রণোদনা ভাতা প্রতিবছরের ১ জুলাই থেকে ধার্য করায় অসংখ্য কর্মচারী এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। জানা যায়, সংক্ষুব্ধ পক্ষগুলো এখন আদালতের শরণাপন্ন হতে পারেন। সেক্ষেত্রে পে-স্কেলের বাস্তবায়ন ঝুলেও যেতে পারে।
নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের মতে, চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে ক্যাডার ও নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করা হয়েছে। কারণ ক্যাডার পদে যোগদানকারীরা বেতন পাবেন অষ্টম গ্রেডে আর নন-ক্যাডাররা পাবেন নবম গ্রেডে। এছাড়া নন-ক্যাডারদের মধ্যেও আবার বৈষম্য তৈরির শঙ্কা রয়েছে। পে-স্কেলের নতুন বিধান অনুযায়ী সরাসরি নিযুক্ত ও পদোন্নতিপ্রাপ্তদের মধ্যে পদোন্নতিপ্রাপ্তদের জ্যেষ্ঠতা দেয়া হয়েছে। ফলে কোনো নন-ক্যাডার পদের কর্মচারী অষ্টম, আবার কেউ কেউ নবম গ্রেডে বেতন ভাতা পাবেন।
শিক্ষা ভাতার ক্ষেত্রেও কিছু সমস্যার কথা বলেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, ২১ বছর বয়স পর্যন্ত শিক্ষাভাতা দেয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ২৫ বছরের কম বয়সে এখন মাস্টার্স উত্তীর্ণ হওয়া যায় না। মাস্টার্স পর্যায়ে খরচের পরিমাণ বেশি। কিন্তু সে সময়ে কোনো অভিভাবক সহায়তা পাবেন না।
অন্যদিকে চাকরির বছরপূর্তিতে বার্ষিক প্রণোদনা দেয়ার বিধান রহিত করে প্রতিবছর ১ জুলাই সবার জন্য এ প্রথা চালু করায় অনেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। যেমন ১ জুলাই’ ১৫ তারিখে যদি কোন কর্মকর্তার পূর্ববর্তী প্রণোদনাপ্রাপ্তির পর এক বছর না হয়ে ৫ মাস ২৯ দিন হয় তবুও তিনি প্রণোদনা পাবেন না। কারণ নতুন বিধানে চাকরিতে ছয়মাস অতিক্রান্ত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
জাতীয় বেতন স্কেল, ২০১৫ কার্যকর হওয়ার তারিখ থেকে বিসিএস ক্যাডারভুক্ত কর্মকর্তাদের প্রবেশ পদ অষ্টম গ্রেডে নির্ধারিত হবে। অপরদিকে, নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের প্রবেশ পদ আগের মতো নবম গ্রেডেই রয়েছে। অন্যদিকে কিছু বিশেষায়িত পদ ছাড়া প্রেষণভাতা উঠিয়ে দেয়ায় এখন কর্মকর্তারা সচিবালয়ের বাইরের কোনো পদে যেতে উত্সাহিত হবেন না। এতে করে নতুন জটিলতা তৈরি হতে পারে।
গত মঙ্গলবার রাতে বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করেছে সরকার। এটি গত বুধবার বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়। বুধবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে বাংলাদেশ সম্মিলিত সরকারি কর্মকর্তা (নন-ক্যাডার) পরিষদ (বাসসকপ)। বিসিএস শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এ কে সেলিম ভুঁইয়া গতকাল বৃহস্পতিবার ইত্তেফাককে বলেছেন নতুন পে-স্কেলে তাদের গ্রেড কমিয়ে দেয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে তারা আগামী ২২ তারিখে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সঙ্গে সাক্ষাত্ করবেন। তারা বলছেন, পে-স্কেল ঘোষণার আগে তারা যেসব দাবি উত্থাপন করেছিলেন তার কোনটিই রক্ষা করা হয়নি।
জানতে চাইলে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি এবং বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের মহাসচিব অধ্যাপক ড. এএসএম মাকসুদ কামাল ইত্তেফাককে বলেছেন, নিয়মিত অধ্যাপকদের মধ্য থেকে যে কয়েকজনকে সিনিয়র সচিব মর্যাদা দেয়ার প্রতিশ্রুতি অর্থমন্ত্রী দিয়েছিলেন তা রক্ষা করা হয়নি। জাতীয় অধ্যাপকদের সিনিয়র সচিব মর্যাদা দেয়ার সুযোগ নেই। সরকার অবসরে যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্য থেকে দুই বছরের জন্য জাতীয় অধ্যাপক নিয়োগ করেন। সুতরাং যারা সিনিয়র সচিব তাদের অবসরে যাওয়ার পর নিশ্চয়ই ওই পদে বসানো হয় না। যা করা হয়েছে তা আইনসিদ্ধ নয়, গ্রহণযোগ্যও নয়।
ড. মাকসুদ কামালের মতে জাতীয় অধ্যাপকদের মর্যাদা সবার ঊর্ধ্বে। তাদের এ প্রক্রিয়ায় নিয়ে এসে অপমান করা হয়েছে।
বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের (নন-ক্যাডার) যুগ্ম মহাসচিব জাকারিয়া হাসান বলেন, সপ্তম বেতন কাঠামোতে ক্যাডার এবং নন-ক্যাডার কর্মকর্তা উভয়ে চাকরিতে প্রবেশ করতেন নবম গ্রেডে। কিন্তু অষ্টম পে-স্কেলে ক্যাডার কর্মকর্তাদের এক ধাপ উপরে তুলে চাকরির প্রবেশে অষ্টম গ্রেড নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে নন-ক্যাডার ও ক্যাডার কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করা হয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশ সম্মিলিত সরকারি কর্মকর্তা পরিষদ (বাসসকপ) লিখিত বিবৃতিতে বলেছে, ঐতিহাসিকভাবে ক্যাডার, নন-ক্যাডার কর্মকর্তারা সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সময় অভিন্ন প্রারম্ভিক বেতন স্কেলে যোগদান করে আসছেন। আগামী ২২ ডিসেম্বর পে-স্কেলে বিদ্যমান অসঙ্গতি সম্পর্কে পর্যালোচনা ও ব্যাখ্যা প্রদানসহ পরবর্তী করণীয় ঘোষণা দেয়া হবে।
অর্থ বিভাগ জানিয়েছে শিক্ষকদের বিষয়টি জটিল। তাই সেটি পুনরায় পর্যালোচনা করে সুপারিশ দিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে বলা হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় যেভাবে সুপারিশ করবে সে আলোকে পুনরায় আলাদা গেজেট জারি করা হবে।
২৬টি বিসিএস ক্যাডারের সংগঠন এবং প্রকৌশলী, কৃষিবিদ ও চিকিত্সকদের সংগঠন প্রকৃচি-বিসিএস সমন্বয় কমিটির স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য স ম গোলাম কিবরিয়া গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, নতুন বেতনকাঠামোয় বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তাদের প্রবেশ পদ অষ্টম গ্রেড আর নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের নবম গ্রেড নির্ধারণের মাধ্যমে বৈষম্যের সৃষ্টি করা হয়েছে। এর ফলে মেধাবীরা বৈজ্ঞানিক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যোগদানে নিরুত্সাহিত হবেন।
স ম গোলাম কিবরিয়ার মতে, টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বাদ দিয়ে চাকরির ১০ বছর ও ১৬ বছর পূর্তিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যে দুটি গ্রেড দেয়ার কথা বলা হয়েছে, তাতে সরকারি চাকরিজীবীরা আগের চেয়ে আর্থিকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
