শোকজ করেই দায় সারছে ইসি

S M Ashraful Azom
0

নির্বাচনী আচরণ বিধি ভঙ্গের জন্য কারণ দর্শানো নোটিশ (শোকজ) করেই দায় সারছে নির্বাচন কমিশন। বর্তমান কমিশনের অধীনে জাতীয় সংসদ, সিটি করপোরেশন, উপজেলা ও স্থানীয় সরকারের অন্যান্য নির্বাচনে গত চার বছরে হাজার হাজার ব্যক্তিকে শোকজ করলেও কারোর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। সঠিকভাবে আচরণ বিধির প্রয়োগ করতে না পারার কারণেই নির্বাচনী মাঠে ব্যাপকভাবে আচরণ বিধির লংঘন হচ্ছে। সর্বোচ্চ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি একটিরও। নির্বাচনী আইনে, বিধি লংঘন করলে সর্বোচ্চ ছয় মাসের জেল অথবা ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ রিটার্নিং কর্মকর্তা নির্বাচনী আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করেন না।
 
নির্বাচনী আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে নির্বাচনী আইন ভঙ্গের যে সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়েছে তার লাগাম টেনে ধরতে আচরণ বিধি কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে শুধু শোকজে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না।
 
নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. জাবেদ আলী ইত্তেফাককে বলেন, ‘সব সময়ে আচরণ বিধির সঠিক প্রয়োগ করা হয়। এই বিধি ভঙ্গ করলে তত্ক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। সব দলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করাই কমিশনের লক্ষ্য। যারা আচরণবিধি ভঙ্গ করবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
 
সর্বশেষ গত ৩ ডিসেম্বর নির্বাচনী আচরণ বিধি ভঙ্গ করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের তিনজন সংসদ সদস্য মেয়র প্রার্থীর সাথে নিয়ে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রার্থীর সঙ্গে তিন এমপির  মনোনয়ন জমাদানের ছবি প্রকাশিত হয়। গত রবিবার ঢাকা-২০ আসনের এমএ মালেক, নাটোর-২ আসনের মো:শফিকুল ইসলাম শিমুল ও বরগুনা-২ আসনের শওকত হাচানুর রহমানকে (রিমন) শোকজ করে ইসি। আগামী তিনদিনের মধ্যে শোকজের জবাব দিতে বলা হয়েছে। এর আগে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আচরণ বিধি ভঙ্গের অভিযোগে যশোর-১ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত আওয়ামী লীগের শেখ আফিল উদ্দিন এবং যশোর-২ আসনের নির্বাচিত মনিরুল ইসলামকে আচরণ বিধি ভঙ্গের জন্য কারণ দর্শানো নোটিশ জারি করে কমিশন। কেন তাদের প্রার্থিতা বাতিল করা হবে না মর্মে জানতে চেয়ে ১০ দিনের সময় দেয়া হয় দুই প্রার্থীকে। এরপর আইনজীবীর মাধ্যমে আওয়ামী লীগের দুই প্রার্থী কমিশনের শোকজের জবাব দেন। দুই বিজয়ী প্রার্থীর বিষয়ে শুনানি করে পরবর্তীতে অভিযোগ থেকে খালাস দেয় কমিশন।
 
ইসির সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, বর্তমান কমিশনের অধীনে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন, ৯টি সিটি করপোরেশনের নির্বাচন, ২০১৪ সালের মার্চ থেকে শুরু হওয়া ৪৮০টি উপজেলা পরিষদের নির্বাচন, জাতীয় ও স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন উপ-নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব নির্বাচনে রিটার্নিং অফিসাররা সহস াধিক প্রার্থী-কর্মী-সমর্থককে শোকজ করে। কিন্তু কারোর বিরুদ্ধে আচরণ বিধি ভঙ্গের সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান প্রয়োগ করা হয়নি। কিছু জায়গায় আচরণ বিধি ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত অর্থদণ্ড করে। কিন্তু শোকজের জবাবের পর কোন ব্যবস্থা গ্রহণের নজির নেই।
 
আচরণ বিধিতে শাস্তির বিধান থাকলেও এখনো পর্যন্ত কাউকে দণ্ড দেয়ার মতো নজির স্থাপন করতে পারেনি কমিশন। কিছু এলাকায় ভ্রাম্যমাণ ম্যাজিস্ট্রেটরা সর্বোচ্চ অর্থদণ্ড করেছে। আচরণ বিধি ভঙ্গে জন্য সাজার বিধান রাখার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্বয়ং ইসির কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, ক্ষেত্র বিশেষ আচরণ বিধি প্রয়োগ হয় রাজনৈতিক দৃষ্টিকোন থেকে। বিধি ভঙ্গ করলে নির্বাচনে শুধু রাজনৈতিক দল, প্রার্থী ও তার কর্মী-সমর্থক নয়, নির্বাচনী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। কিন্তু বিধির সঠিক প্রয়োগ না করার কারণে মাঠ পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রার্থী ও নির্বাচনী কর্মকর্তারা ঢালাওভাবে আচরণবিধি ভঙ্গ করে চলেছেন। প্রাক নির্বাচনী প্রচারণা ঠেকাতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রাখার বিধান থাকলেও এবারের পৌর নির্বাচনে তা মানা হয়নি। আবার ইসি সচিবালয়ে অব্যবস্থাপনার কারণে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কাজের কোন সমন্বয়ও নেই। ফলে মাঠ পর্যায়ে কি পরিমাণ আচরণ বিধি লংঘন হচ্ছে তা জানা কঠিন হয়ে পড়েছে।
 
আইন মানেন না রিটার্নিং কর্মকর্তারা
 
আইনে রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে একাধিক প্রার্থী মনোনয়নের বিধান নেই। কিন্তু তা মানেননি খুলনার পাইকগাছা, মাগুরা ও বরগুনার বেতাগি পৌরসভার দায়িত্বপ্রাপ্ত রিটার্নিং অফিসাররা। আবার স্থানীয় রাজনৈতিক ও প্রশাসনের প্রভাবে বেশকিছু রিটার্নিং কর্মকর্তা প্রার্থিতা বাতিল করেছে বলে অভিযোগ এসেছে। একটি পৌরসভার মেয়র প্রার্থী উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে থেকে নির্বাচন করলেও প্রার্থিতা বাতিল করেননি রিটার্নিং কর্মকর্তারা। ঘটনাটি রিটার্নিং অফিসারকে জানানোর পর ওই পৌরসভায় সরকার দলীয় এক প্রাথীকে ডেকে এনে তাকে পদত্যাগ করুন। আর তা মনোনয়নপত্র জমার শেষদিন ৩রা ডিসেম্বর বিকাল ৫টার পর তা পাঠানো হয় জেলা প্রশাসকের কাছে।
 
একইভাবে নির্বাচনী আইনে মনোনয়নপত্র জমার সময় কাউকে বাধা দেয়ার সুযোগ না থাকলেও ফেনী, চাঁদপুরে প্রার্থী বাধার মুখে মনোনয়ন জমা দিতে পারেননি। চট্টগ্রামের রাউজানে ও মাগুরা সদরের প্রার্থীর হলফনামায় মিথ্যা পাওয়া যায়। তাদেরকে বৈধ প্রার্থী ঘোষণা করা হয়। কিন্তু ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ থাকলেও রিটার্নিং অফিসাররা ছিলেন নির্বিকার।
ট্যাগস

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

খবর/তথ্যের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, সেবা হট নিউজ এর দায়ভার কখনই নেবে না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Know about Cookies
Ok, Go it!
To Top