
সেবা ডেস্ক: বাংলাদেশ সরকারের অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, আগে খরচ করব, পরে চিন্তা করব টাকা কোথা থেকে আসবে। কারণ, আগে দেশের জনগনকে রক্ষা করতে হবে। এ জন্য প্রস্তাবিত বাজেট গতানুগতিক ধারার হয়নি। গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে পেশকৃত ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট সম্পর্কে সংবাদ সম্মেলনে এমন মন্তব্য করেছেন তিনি। ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে আরও বলেন, কোথা থেকে টাকা আসবে, সেটি চিন্তা করা হয়নি। সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী অন্যসব বাজেটের ক্ষেত্রে আগে টাকার কথা চিন্তা করা হতো। মূলত করোনাভাইরাসের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে বাঁচানোর জন্য এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
বাজেট ঘোষণার পরদিন প্রতিবছর অর্থমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলন করে থাকেন। সেখানে বাজেটের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন। কিন্তু এ বছর এ সংবাদ সম্মেলন ব্যক্তিক্রম। করোনার কারণে ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে জুমের মাধ্যমে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়েছেন অর্থমন্ত্রী। এতে অংশ নিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক, পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান, প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. আসাদুল ইসলাম, অর্থ সচিব আবদুর রউফ তালুকদার, পরিকল্পনা বিভাগের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য ড. শামসুল আলম প্রমুখ।
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে অর্থমন্ত্রী বলেন, করোনা মোকাবেলার জন্য স্বাস্থ্যসেবার পর কৃষিকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। আগামীতে কৃষি ভালোভাবে সাজানো হবে। আর প্রস্তাবিত বাজেটে দুটি কৌশল নেয়া হয়েছে। প্রথমত, করোনায় অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত দিকগুলো সমন্বয় করে আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া এবং সার্বিক ক্ষতি সমন্বয় করা।
কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিগত সময়ে অর্থ পাচারের ঘটনায় কয়েকটি মামলা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে মামলা হয়নি। অর্থ পাচার প্রতিরোধের আইনগুলো খতিয়ে দেখা হবে। প্রয়োজনে সংস্কার করা হবে। তিনি আরও বলেন, দেশে পণ্য আসেনি, কিন্তু বিদেশে টাকা চলে গেছে-এমন ঘটনা আগে অনেক শোনা যেত। এখন সেটি কমে আসছে। এ জন্য সর্বত্র অটোমেশনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আর বাকিটা রোধ করতে হবে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। তবে একটি কথা মনে রাখতে হবে-কোনো সরকার চাইবে না, দেশ থেকে টাকা বিদেশ চলে যাক। যারা এ দেশে টাকা খরচ করতে চায় না, তারা বিদেশে চলে যাক।
অস্বাভাবিক রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য নির্ধারণ কতটা বাস্তবসম্মত-জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমান কর আদায়ের হার জিডিপির ১০-১১ শতাংশ। এটি ১৫-১৭ শতাংশে নিতে পারলে টাকার সমস্যা হবে না। এ জন্য আমরা ভ্যাট মেশিন স্থাপনের কাজ শুরু করেছি। আর ৮ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, বিগত ১০ বছরের অর্জনের ধারাবাহিকতা, বিগত পাঁচ বছরের মাথাপিছু আয় বিবেচনায় নিয়েই এ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে। করোনার আঘাতে প্রবৃদ্ধি সম্পর্কে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণকে বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। ফলে বিগত সময়ে অর্জন ও অভিজ্ঞতা থেকে এ বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। আশা করছি, এ বাজেট বাস্তবায়ন করা যাবে।
পুঁজিবাজার প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, পুঁজিবাজারকে অনেক উপরে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। তবে বর্তমান এ খারাপ অবস্থা করোনাভাইরাসের কারণে হয়নি। পুঁজিবাজারের অবস্থা আগে থেকেই খারাপ। এখন নিয়ন্ত্রণ সংস্থা নতুন চেয়ারম্যানসহ একটি টিম আসছে। তারা কাজ করবে। সরকারও ভালো শেয়ার বাজারে নিয়ে আসবে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ২ শতাংশ অর্জনের জন্য জিডিপির ২৫ দশমিক ৩ শতাংশ বেসরকারি বিনিয়োগ দরকার। বর্তমানে হবে ১২ দশমিক ৭ শতাংশ। এমন কী জাদু আছে, এক বছরে পৌনে ১৩ শতাংশ বিনিয়োগ বাড়বে-এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য দেশে ১শ’ অর্থনৈতিক জোন প্রস্তুত করা হচ্ছে। বর্তমান করোনাভাইরাসের কারণে বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সংস্কার হবে। নতুন নতুন এলাকা চিহ্নিত হবে। সে সুযোগ আমরা গ্রহণ করব। এ ছাড়া কর আদায়ের হার জিডিপির ১১ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ নিতে পারলে অর্থের অভাব হবে না। সে অর্থও বিনিয়োগে আসবে। অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে স্থানীয় শিল্প সুরক্ষায় নানা পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা স্থানীয় শিল্পে বিনিয়োগ করে এ সুবিধা নিতে পারেন। আমাদের দরকার মানুষকে বাঁচানো। এতদিন বুঝতে পারিনি কেন বিদেশি বিনিয়োগ কম আসে। এখন বুঝতে পারছি। এ জন্য সবকিছু খোলাসা করা হচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, এখন ব্যাংক ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশ। আগে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি পেত। আগামীতে সেটি আর হবে না। একটি প্রতিযোগিতামূলক সুদহার নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে বিদেশি বিনিয়োগ কমবে না।
ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নেয়া হচ্ছে। আবার করোনাভাইরাসের প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে ঋণ নেয়া হবে। শেষ পর্যন্ত ব্যাংক সামাল দিতে পারবে কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, আমি দায়িত্ব নেয়ার আগে ব্যাংকগুলোয় খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেশি ছিল। তারল্য ভালো ছিল না। এখন সে অবস্থা নেই। ব্যাংকে গিয়ে টাকা না পেয়ে ফেরত আসছে বা টাকা না দিয়ে ব্যাংক খারাপ ব্যবহার করছে-এমন ঘটনা এখনও হয়নি। আবার এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নে ব্যাংকে অনেক টাকা থাকতে হবে এমনটিও নয়। অর্থের জন্য নতুন নতুন ক্ষেত্রও সন্ধান করা হচ্ছে। এ জন্য পুঁজিবাজারকে আরও গতিশীল ও গভীরে নেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বড় রাজস্ব আহরণ সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম বলেন, রাজস্ব আহরণে আমরা চ্যালেঞ্জ নিতে রাজি আছি। তবে করোনাভাইরাসের প্রভাব অব্যাহত থাকলে সেটি অর্জন করা সমস্যা হবে। তবে এর প্রভাব কমে গেলে এ রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব। তিনি আরও বলেন, কর আদায়ের হার জিডিপির অনুপাতে কম-এটি এক ধরনের ব্যর্থতা। কারণ, জিডিপির অনুপাতে কর বাড়াতে করের পরিমাণ বাড়ানো হতো। কিন্তু দরকার ছিল কর-জালের আওতায় বাড়ানো। এখন আমরা কর-জালের আওতা বাড়াব। পাশাপাশি কর ফাঁকি রোধসহ সবকিছুতে অটোমেশন করা হবে। মোবাইলের ওপর ডিউটি আরোপ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মোবাইল সেবার ওপর মাত্র ৫ শতাংশ ডিউটি আরোপ করা হয়েছে। এটি ব্যবহারকারীদের বহন করার সক্ষমতা আছে। মোবাইল কলরেট কম বিধায় মানুষের মধ্যে এক ধরনের বেশি কথা বলার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। ফলে বর্ধিত ডিউটি তারা পরিশোধ করতে পারবে।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বলেন, ১০ লাখ টাকার উপরে ব্যাংকে থাকলে গ্রাহকদের আবগারি শুল্ক দিতে হবে। এটি আগেও ছিল। এ বছর আড়াই হাজার থেকে বাড়িয়ে তিন হাজার টাকা করা হয়েছে। তবে বেশি টাকার ক্ষেত্রে আরও বেশি আরোপ করা হয়েছে। তবে ১০ লাখ টাকার নিচের গ্রাহকদের ব্যাপারে কোনো হস্তক্ষেপ করা হয়নি।
তিনি আরও বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটের ঘাটতি ৮৫ হাজার কোটি টাকা নেয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকের কোনো সমস্যা হবে না। ইতোমধ্যে সরকার চলতি বাজেটের আওতায় ৭৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে ব্যাংক থেকে। আরও কিছু ঋণ নেবে। কারণ, সংশোধিত বাজেটে ৮২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার পরিকল্পনা আছে সরকারের। ফজলে কবির বলেন, এই মুহূর্তে ব্যাংকগুলোয় ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা পড়ে আছে। টাকা নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না। করোনাভাইরাসের কারণে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। এটি বাস্তবায়নেও কোনো সমস্যা নেই।
সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী বলেন, বিএনপি-জামায়াত সরকার আসার পর সারা দেশের কমিউনিটি ক্লিনিক বন্ধ করে দেয়। এই সরকার ক্ষমতায় এসে তা চালু করে। সরকার ডাক্তার ও হেলথ টেকনিশিয়ান নিয়োগ দিয়েছে। টেলিমেডিসিন চালু করেছে। এ জন্য আরও এক হাজার কমিউনিটি ক্লিনিং করার ঘোষণা দিয়েছে সরকার।
অর্থ সচিব আবদুর রউফ তালুকদার বলেন, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ আরও বাড়ানো গেলে ভালো হতো। কিন্তু মনে রাখতে হবে- ব্যয় করার সক্ষমতা তাদের কতটুকু। প্রতিবছর স্বাস্থ্য খাতে অতিরিক্ত এক থেকে দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় করতে পারে না। এ বছর আমরা সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা বেশি বরাদ্দ দিয়েছি। পাশাপাশি অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে থোক বরাদ্দ ১০ হাজার কোটি টাকা রাখা হয়েছে। এখান থেকে নিয়েও স্বাস্থ্য বিভাগ প্রয়োজন মেটাতে পারবে।

খবর/তথ্যের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, সেবা হট নিউজ এর দায়ভার কখনই নেবে না।