![]() |
| রৌমারীতে শতাধিক পরিবারকে ‘একঘরে’ করার অভিযোগ, পণ্য বেচলেই দোকানদারের জরিমানা |
রৌমারীতে শতাধিক পরিবারকে ‘একঘরে’ করার অভিযোগ, পণ্য বেচলেই দোকানদারের জরিমানা
কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলায় প্রায় শতাধিক পরিবারকে সমাজচ্যুত বা ‘একঘরে’ করে অবরুদ্ধ রাখার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহলের বিরুদ্ধে। এমনকি ওই অবরুদ্ধ পরিবারগুলোর সদস্যদের কাছে কোনো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি করলে স্থানীয় দোকানদারকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হবে বলে বাজারে প্রকাশ্য মাইকিং করা হয়েছে।
গত ২৫ জুন কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী উপজেলার দাঁতভাঙ্গা ইউনিয়নের হাজির হাট এলাকায় এই অমানবিক ঘোষণা দেওয়া হয়। গত মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) হাজির হাট বাজারে সরেজমিনে গিয়ে এই ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেছে। এই ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর পক্ষে মাহফুজুল হক নামের এক ব্যক্তি প্রতিকার চেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং রৌমারী থানাসহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা ও লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, প্রায় দুই বছর আগে হাজিরহাট ও বালুরগ্রাম এলাকার একটি কবরস্থানের জমি নিয়ে গ্রামবাসীদের দুটি পক্ষের মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হয়। ওই সময় মারামারি ও আহতের ঘটনাও ঘটে। এই ঘটনার জের ধরে গত ২৫ জুন হাজির হাট বাজারে একটি সালিশি বৈঠক বসে। সেখানে স্থানীয় মাতাব্বর ও হাট ইজারাদার আসাদুজ্জামান এবং বাজার বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম মিঠুর নির্দেশনায় ওই বংশের শতাধিক পরিবারকে একঘরে করার একতরফা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ঘোষণা অনুযায়ী, ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কোনো প্রতিবেশী কথা বললে বা ওঠবস করলে তাদেরকেও একঘরে করা হবে। এমনকি এই অবরুদ্ধ পরিবারের কেউ বাজার, স্কুল কিংবা রাস্তাঘাটে চলাফেরা করলে তাঁদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়েছে।
ভুক্তভোগী আজিজুল হক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা শতাধিক পরিবার একই গোষ্ঠীর লোক। কবরস্থানের মারামারির ঘটনার সঙ্গে আমাদের অনেকেরই কোনো সম্পৃক্ততা নেই। শুধু একই বংশের হওয়ার অপরাধে আমাদের সবাইকে একঘরে করা হয়েছে। ঘোষণার রাতে একদল লোক আমাদের বাড়িতে ঢিল ছুড়ে আতঙ্ক তৈরি করে। কোনো দোকানদার আমাদের কাছে চাল-ডাল বা ওষুধও বিক্রি করছেন না।” আরেক ভুক্তভোগী আকতার হোসেন বলেন, “আমরা কার্যত বাড়িতে অবরুদ্ধ। আমাদের ছোট ছোট শিশুরা দোকানে গেলেও তাদের তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। আমরা বাইরে বের হলেই ওরা লাঠিসোটা নিয়ে তেড়ে আসে।”
সালিশে উপস্থিত থাকা হাজির হাট বাজারের এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “একঘরে করার সিদ্ধান্তের সময় আমরা বাজারে ছিলাম। হাট ইজারাদার ও বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদকের হুকুম না মানলে দোকানদারদের ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হবে বলে মাইকিং করা হয়েছে। তাই পিঠ বাঁচাতে আমরা তাদের পক্ষে আছি। তবে কাজটা মোটেও ঠিক হচ্ছে না।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে হাট ইজারাদার আসাদুজ্জামান ও আমির হোসেন ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, “কবরস্থান নিয়ে আমরা একটি সিদ্ধান্ত দিয়েছিলাম। কিন্তু ওই পরিবারগুলো তা অমান্য করায় সমাজ ও বাজারের পক্ষ থেকে তাদের একটু চাপে রাখা হয়েছে।”
দাঁতভাঙ্গা ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও বাজার বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম মিঠু বলেন, “তারা আমাদের কথা না মানায় তাদের কাছে সদাই-পাতি বিক্রি করতে নিষেধ করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের সময় বাজারে প্রায় দুই হাজার লোক উপস্থিত ছিল।”
রৌমারী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) কাওসার আলী জানান, “আমরা একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। এরপরই ওই এলাকায় পুলিশ পাঠানো হয়েছিল এবং উভয় পক্ষের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। স্থানীয়ভাবে দ্রুত বিষয়টি সমাধান করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে, তা না হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এ বিষয়ে রৌমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আলাউদ্দিন বলেন, “জমিজমা সংক্রান্ত বিষয়ে আদালত রায় দেবে। এর সঙ্গে হাট-বাজারের কেনাকাটা বা মৌলিক অধিকার বন্ধ করার কোনো সম্পর্ক নেই। কাউকে এভাবে সমাজচ্যুত বা একঘরে করার সুযোগ আইনে নেই। আমি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”







খবর/তথ্যের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, সেবা হট নিউজ এর দায়ভার কখনই নেবে না।