এক ॥“হে আল্লাহ! পরোয়ারদিগার আমার পিতামাতার প্রতি রহমত নাযিল কর, যেমন করে তারা দু’জনে আমাকে আমার ছোট অবস্থায় লালন-পালন করেছে”। সকল প্রশংসা সেই মহান প্রভুর নামে, যিনি আমাদেরকে আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে সৃষ্টি করে পিতামাতার মাধ্যমে এ জগতে প্রেরণ করেন। আল্লাহ পাক দুনিয়ার সকল আদম সন্তানকে মাতা-পিতার মাধ্যমে এ পৃথিবীতে প্রেরণ করে জন্ম লগ্ন থেকে শুরু করে মৃত্যু অবধি তাদের সকল প্রকার করণীয় নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহপাক পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেন “আমি জ্বিন এবং ইনসানকে সৃষ্টি করেছি শুধুমাত্র আমার ইবাদতের জন্যই”। এ আয়াতের মাধ্যমে সুস্পষ্টভাবে বুঝা যায় মানব জাতি সৃষ্টির অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হল কেবলমাত্র আল্লাহরই ইবাদত করা। আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মানুষ জাতির জন্য প্রেরিত অন্যান্য কার্যবলীর মধ্যে কতিপয় কার্যাবলীকে অত্যাবশ্যকীয় হিসেবে মানুষের জন্য অবতীর্ণ করে তা পালন করার আদেশ প্রদান করার পাশাপাশি কিছু কাজকে বান্দার জন্য হারাম বা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে তা থেকে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করার জন্য কঠোরভাবে নির্দেশ প্রদান করেন। পিতা-মাতার সাথে খারাপ ব্যবহার করা, আচার-আচরণ দ্বারা তাদের মনে দুঃখ, কষ্ট দেয়া, তাদের সাথে অশালিন আচরণ করা, তাদের অবাধ্য হওয়া, বিপদে-আপদে সাধ্যানুসারে তাদের সাহায্য সহযোগিতা না করা এবং জীবনের পড়ন্ত বেলায় তাদেরকে ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যাওয়াকে আল্লাহপাক সন্তানের জন্য হারাম বা নিষিদ্ধ কর্ম হিসেবে উল্লেখ করেন। কেননা পিতামাতার সাথে সদ্ব্যহার করা সন্তানের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশিত একটি ইবাদত সমতুল্য অত্যাবশ্যকীয় বিধান। আল্লাহর হক আদায় করার পরপরই বান্দার জন্য তার পিতামাতার হক অগ্রগণ্য। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনের সূরা বণি ইসরাঈল এর ২৩-২৪নং আয়াতে আল্লাহপাক স্পষ্ট ভাষায় এরশাদ করেন “আপনার প্রভু নির্দেশ দিচ্ছেন, তোমরা কেবল তারই ইবাদত করবে এবং পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে, তাদের উভয়ের মধ্য থেকে যে কোন একজন বা উভয়জন বৃদ্ধ হয়ে গেলে তোমরা তাদেরকে “উহ” পর্যন্ত বলবে না, তাদেরকে ধমক দিবে না, বরং তাদের সাথে সম্মানের সাথে কথা বলবে, বিনয় এবং নম্রতা সহকারে তাদের সামনে অবনত থাকবে এবং তাদের জন্য প্রার্থনা করতে থাকবে (হে আল্লাহ), হে আমাদের রব! আমার পিতামাতার প্রতি দয়া করুণ যেভাবে শৈশবে আমার প্রতি দয়া করেছিল”। একই প্রসঙ্গে আল্লাহপাক পবিত্র কোরআনের সূরা নিসার ৩৬নং আয়াতে এরশাদ করেন “আর আল্লাহর ইবাদত করো, তার সাথে কোন কিছুর শরীক স্থাপন করো না, এবং পিতামাতার সাথে অসদাচরণ করো না এবং নিকট আত্মীয়-স্বজনদের সাথে, এতিম, মিসকিন, প্রতিবেশী, অসহায় মুসাফির এবং নিজের দাস-দাসীদের প্রতিও, নিশ্চয় আল্লাহপাক অহংকার ও দাম্ভিক ব্যক্তিদের পছন্দ করেন না”। তাছাড়া সূরা লুকমানে আল্লাহপাক আরও এরশাদ করেন “তোমাদের পিতামাতা যদি তোমাদেরকে আমার সাথে কাউকে শরীক স্থাপন করতে পীড়াপীড়ি করে তোমরা সে ক্ষেত্রে তাদের কথা মানবে না, তবে তাদের সাথে সদাচরণ বজায় রাখবে”। উক্ত আয়াতে বুঝা যা যে, পিতামাতার আদেশটি যদি আল্লাহর একত্ববাদের সাথে সাংঘর্ষিক হয় তবে পিতামাতার আদেশের পরিবর্তে আল্লাহর আদেশই অগ্রাধিকার পাবে। এক্ষেত্রে পিতামাতার আদেশ পালন করা যাবে না বটে তবে তাদের সাথে অত্যন্ত বিনয়ের আচরণ করতে হবে। কোন অবস্থাতেই আচার আচরণ, ব্যবহারের দ্বারা তাদের মনে কষ্ট দেয়া যাবে না। তাছাড়া পরিবেশ পরিস্থিতির আলোকে পিতামাতা যদি সন্তানের ওপর (সন্তানের দৃষ্টিতে) যুলুমও করে তবুও পিতা-মাতার সাথে নাফরমানি করা যাবে না, তাদের অবাধ্য হওয়া যাবে না। আর উপরোক্ত অবস্থায়ও পিতামাতার সাথে নাফরমানি করলে সন্তানকে অবশ্যই জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করতে হবে। ইহাই চিরন্তন সত্য। কেননা পিতামাতার সাথে ভাল ব্যবহার না করা, তাদের সাথে সর্ম্পক ছিন্ন করা, তাদের সাথে নাফরমানি করা অত্যন্ত বড় গুনাহ এবং এর শাস্তি অবধারিত। পিতামাতার সাথে নাফরমানির শাস্তি মৃত্যুর আগেই দুনিয়াতেই প্রদান করা হয়ে থাকে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহপাক পবিত্র কোরআনের সূরা মুহাম্মদ এ উল্লেখ করেন “তোমরা কি ভেবে দেখেছ তোমরা যদি জমিনে বিপর্যয়ের সৃষ্টি করো এবং হেরেম ছিন্ন করো, তাহলে আল্লাহ তাদের উপর অভিসম্পাত করবেন এবং এরপর তাদের বধির ও অন্ধ করে দিবেন”। তাছাড়া পবিত্র কোরআনের আরও কিছু আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহপাক বান্দাকে তার ইবাদত করতে এবং তার সাথে কোন কিছুর শরীক না করতে কঠোর হুশিয়ারী উচ্চারণ করার পাশাপাশি পিতামাতার প্রতি কৃতজ্ঞতা পোষণ এবং তাদের প্রতি শিষ্টাচার পূর্ণ আচার-আচরণ করার তাগিদ প্রদান করেন। আল্লাহ তাআলার ইবাদত করার পর আসমানের নিচে আর জমিনের উপরে পিতামাতার চেয়ে অধিক সম্মানের, সদাচরণের উপযোগী, অধিক কৃতজ্ঞা প্রকাশের মাধ্যম পৃথিবীতে সন্তানের জন্য দ্বিতীয় আর কেউ নেই। এ প্রসঙ্গে হাদিসে উল্লেখ আছে যে, নবীজি (সা.) কে এ মর্মে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় কি কাজ নবীজী (সা.) তখন বললেন ঠিক সময়মত নামায পড়া আর পিতামাতার সাথে ভাল ব্যবহার করা। পক্ষান্তরে সবচেয়ে বড় গুনাহ কি কি এর জবাবে নবীজী (সা.) বললেন আল্লাহর সাথে কোন কিছুর শরীক করা আর পিতামাতার সাথে সর্ম্পক ছিন্ন করা”। এ ব্যাপারে প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে আরও বর্ণিত আছে, নবীজী (সা.) এরশাদ করেন “আল্লাহর সাথে কোন কিছুর শরীক করা, পিতামাতার অবাধ্য হওয়া, কোন মানুষকে হত্যা করা (অন্যায় ভাবে) এবং মিথ্যা স্বাক্ষ্য প্রদান করা কবীরা গুনাহে অন্তর্ভুক্ত”। ইসলাম পিতামাতার খেদমত ও তাদের সাথে সদ্ব্যবহারের প্রতি এত গুরুত্ব প্রদান করে যে, পিতামাতার অনুমতি ব্যতিত সন্তানকে জিহাদে পর্যন্ত অংশগ্রহণের অনুমতি প্রদান করে না। এ ব্যাপারে সিয়াহ সিত্তাহ হাদিসে সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন “এক ব্যক্তি নবীজী (সা.)-এর সামনে এসে বলল আমি আপনার কাছে জিহাদ এবং হিজরতের বাইয়াত গ্রহণ করতে চাই এবং আল্লাহ তা’আলার কাছে প্রতিদানের আশা রাখি। নবীজী (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, তোমার পিতামাতার মধ্যে কেহ কি জীবিত আছে? তিনি বললেন হ্যাঁ, উভয়েই। নবীজী (সা.) বললেন এরপরও তুমি প্রতিদানের আশা কর? সে বলল হ্যাঁ, তখন নবীজী (সা.) বললেন ফিরে যাও এবং তাদের সাথে সদ্ভাবে বসবাস কর”। তাছাড়া আবু দাউদ শরীফে উল্লেখ আছে “ইয়ামেন থেকে এক ব্যক্তি জিহাদে অংশগ্রহণ করার জন্য রাসূল (সা.)-এর দরবারে হাজির হল। তখন নবীজী (সা.) জিজ্ঞেস করলেন বাড়িতে তোমার কে কে আছে? সে বলল বাপ, মা সবাই আছেন। তাদের অনুমতি নিয়ে এসেছ কি-না (জানতে চাইলে)। লোকটি বলল না। নবীজী (সা.) বললেন তুমি তাদের কাছে ফিরে যাও এবং অনুমতি চাও অনুমতি দিলে ফিরে এসে জিহাদে শরীক হবে আর অনুমতি না দিলে তাদের কল্যাণময় খেদমতের কাজে লেগে থাকবে”। (এখানে উল্লেখ্য যে, যেহেতু জিহাদে অংশগ্রহণ করা ফরজে কেফায়া সেহেতু এ বিধান। আর যদি ফরজে আইন হয় তবে সে ক্ষেত্রে আলাদা বিধান)। পিতামাতার উপর সর্বাবস্থায় শ্রদ্ধা এবং সদাচরণের ব্যাপারটি ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।তাই ইসলাম পিতামাতার খেদমত করে বেহেশত যাওয়ার পথকে প্রসারিত করার জন্য সন্তানদেরকে নির্দেশ প্রদান করেছেন। এ প্রসঙ্গে মুসলিম শরীফে এরশাদ আছে “যে লোক তার পিতামাতার দু’জনকেই কিংবা একজনকে বৃদ্ধা অবস্থায় পেল অথচ খেদমত করে জান্নাতবাসি হওয়ার অধিকারী হল না তার মত হতভাগ্য আর কেউ নেই”। অর্থাৎ সন্তান জান্নাতে যাওয়ার জন্য মাতাপিতার খেদমত হল একটি সহজ সরল রাস্তা। মাতা-পিতা হচ্ছে সন্তানের জন্য জান্নাত কিংবা জাহান্নামের মধ্যবর্তী একটি দরজা। এ ব্যাপারে সুনানে তিরমিজি শরীফে হযরত আবু দারদা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে নবীজী (সা.) এ প্রসঙ্গে এরশাদ করেন “পিতামাতা হচ্ছে জান্নাতের দরজা সমূহের মধ্যম দরজা। ইচ্ছে করলে তা সংরক্ষণ করো, বা নষ্ট কর”। তাছাড়া হাদিসে আরও বণিত আছে “কোন নেককার সন্তান যখন স্বীয় পিতামাতার প্রতি রহমতের দৃষ্টিতে ভক্তি সহকারে তাকায়, তখন আল্লাহপাক তার প্রতিটি দৃষ্টির বিনিময়ে একটি কবুল হজ্বের সওয়াব প্রদান করেন”। সন্তানের জন্য পিতামাতার দোয়া অব্যর্থ এক তীর যা কখনই আল্লাহর দরবারে যাওয়ার নিশানা ভুল করে না এ প্রসঙ্গে হযরত মুসা (আ:)- এর সাথে এক কসাই যুবকের বেহেশত যাওয়ার গৌরব অর্জন করার ঘটনাটি বিশেষভাবে উল্লেখ্য।

