মংলা-ঘষিয়াখালী চ্যানেল খননে ধীরগতি, প্রশাসন ব্যস্ত বাঁধ অপসারণে

S M Ashraful Azom
মংলা সমুদ্র বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ মংলা-ঘষিয়াখালী চ্যানেল চালুর লক্ষ্যে চ্যানেল সংলগ্ন নদী-খালের অবৈধ বাঁধ অপসারণের কাজ ফের শুরু করেছে বাগেরহাট জেলা প্রশাসন। গত ১৮ দিনে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ৮২টি খালের মধ্যে ৩০টির অবৈধ বাঁধ অপসারণ করেছে তারা। এদিকে চ্যানেলটির নাব্যতা ফেরাতে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষর (বিআইডব্লিউটিএ) খনন কাজ চলছে ঢিমেতালে। প্রায় সোয়া দুইশ’ কোটি টাকার এই কাজ গত জুনে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা করতে পারেনি সংস্থাটি। খননের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট খালগুলো প্রবাহমান হলে চ্যানেলটি দ্রুত সময়ের মধ্যে পুরোপুরি চালু করা যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে অনেকের মতে, এজন্য সরকারি অর্থের সদ্ব্যবহার নিশ্চিতসহ খনন কাজ সঠিকভাবে এগিয়ে নিতে দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয় জরুরি। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনে সেনাবাহিনীর সহায়তার দাবিও উঠেছে।
 
মংলা বন্দরের পশুর নদী থেকে মংলা নদীটি রামপালের কুমারখালী নদী হয়ে মোরেলগঞ্জের পানগুছি নদীতে গিয়ে মিশেছে। যা মংলা-ঘষিয়াখালী নৌপথ নামে পরিচিত। নৌ চ্যানেলটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৩১ কিলোমিটার। এই নৌপথ দিয়ে পণ্য পরিবহন সহজতর করতে ১৯৬৯-৭০ সালে বিআইডব্লিউটিএ ঘষিয়াখালী ও বেতবুনিয়া খালটি খনন করে। এর পর থেকে মংলা-ঘষিয়াখালী হয়ে ওঠে মংলা সমুদ্র বন্দরের নির্ভরযোগ্য নৌপথ। কিন্তু দীর্ঘদিন খনন না হওয়া এবং চ্যানেল সংশ্লিষ্ট শাখা নদী-খালগুলো অবৈধভাবে দখল করে বাঁধ দিয়ে  চিংড়ি চাষের ফলে দ্রুত পলি জমে ভরাট হয়ে যায় নৌপথটি। চ্যানেলটি পুনরায় চালুর লক্ষ্যে ২০১৪ সালের জুলাইয়ে চ্যানেলের ২২ কিলোমিটারে খননের কাজ শুরু করে বিআইডব্লিউটিএ। কিন্তু শুরু থেকেই ঝিমিয়ে চলছে ওই খনন কাজ। এর মধ্যে ২০১৪ সালের ৯ ডিসেম্বর সুন্দরবনের শ্যালা নদীতে তেলবাহী ট্যাঙ্কার ডুবির পর আবারো আলোচনায় আসে মংলা-ঘষিয়াখালী নৌপথটি। চ্যানেলটি দ্রুত চালু করতে নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ফের শুরু হয় তোড়জোড়।
 
জানা গেছে, নৌ-চ্যানেলটির নাব্যতা ফেরাতে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ নিবিড় খনন কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। খনন কাজ যাতে বাধাগ্রস্ত না হয় সে জন্য চ্যানেলের সঙ্গে সংযুক্ত বিভিন্ন খালে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৫৯ কোটি টাকার স্লুইস গেট নির্মাণ কাজ স্থগিত রাখা হয়েছে। কিন্তু তবুও প্রতিশ্রুত চলতি বছরের জুন মাসের মধ্যে খনন কাজ শেষ করতে পারেনি বিআইডব্লিউটিএ। কবে নাগাদ এই খনন কাজ শেষ হবে তা-ও বলতে পারেনি তারা।
 
বিআইডব্লিউটিএ’র তত্ত্বাবধায়ক (ড্রেজিং) প্রকৌশলী এএইচ মো. ফরহাদুজ্জামান জানান, বর্তমানে চ্যানেলটি দিয়ে ৮ ফুট গভীরতাসম্পন্ন জাহাজ চলাচল করতে পারছে। খনন কাজ অব্যাহত আছে। এখন পর্যন্ত প্রায় একশ চল্লিশ কোটি টাকার কাজ হয়েছে। চ্যানেল সংশ্লিষ্ট খালগুলোর অবৈধ বাঁধ অপসারণ ও খনন করা হলে মংলা-ঘষিয়াখালী চ্যানেলে পানির প্রবাহ বেড়ে যাবে। যা চ্যানেলটি নাব্য করতে ও পলি অপসারণে সহায়ক হবে।
 
জানা গেছে, গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর রামপাল সদর ইউনিয়নের ওড়াবুনিয়া খালের বাঁধ উচ্ছেদের কাজ শুরু করে স্থানীয় প্রশাসন। সে সময় অবৈধ বাঁধ অপসারণের জন্য মংলা-ঘষিয়াখালী চ্যানেলের সঙ্গে সংযুক্ত ৩২টি প্রধান খাল চিহ্নিত করা হয়। কাজও হয় কিছুটা। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই ঝিমিয়ে পড়ে প্রশাসনের ওই অভিযান। পরে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে গত ৫ আগস্ট থেকে আবারো মাঠে নামে বাগেরহাট জেলা প্রশাসন।
 
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, দ্বিতীয় দফায় উপজেলার মোট ৮২টি খাল চিহ্নিত করা হয়েছে। এরই মধ্যে উপজেলার চারটি ইউনিয়নের ৩০টি খালের ১০৫টি ও দুটি পাটা বাঁধ অপসারণ করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।
 
জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর আলম জানান, সরকারি রেকর্ডভুক্ত এসব খালের নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে সেখানে স্থাপিত অবৈধ বাঁধ অপসারণে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জেলা প্রশাসন অভিযান শুরু করেছে। তবে বাঁধ অপসারণ খাতে আরো বরাদ্দের প্রয়োজন। বাঁধ অপসারণের পর আগামী শুকনো মৌসুমে রামপালের খালগুলো খননের পরিকল্পনাও নেয়া হয়েছে। এ জন্য একটি প্রকল্প চূড়ান্ত করার কাজ চলছে বলে তিনি জানান।
 
বাঁধ কাটায় বাধা:এদিকে বাঁধ অপসারণের কারণে এলাকার সাধারণ মানুষ খুশি হলেও সুবিধাভোগীদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় প্রভাবশালী ও জনপ্রতিনিধিদের অধিকাংশই প্রকাশ্যে না হলেও এই বাঁধ কাটার বিপক্ষে বলে জানা গেছে। রামপালের বাঁশতলী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক এবং ৪ নং ইউপি সদস্য গাজী আলমগীর হোসেনসহ অনেকেই মনে করেন, খালে বাঁধ না থাকলে এলাকা জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হবে।
 
তবে রামপাল উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আব্দুল জলিল বলেন, চ্যানেল চালুর জন্য সরকার যেভাবে এগোচ্ছে তা পুরোপুরি সঠিক নয়। প্রশাসনের উচিত ছিলো অর্থের অপচয় না করে যারা বাঁধ দিয়েছে তাদের দিয়ে বাঁধ অপসারণ করা। প্রয়োজনে তাদের সাজার ব্যবস্থা করলে এই প্রবণতা বন্ধ করা যেত। এই কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজনে সেনাবাহিনীর সহায়তা নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
 
বাঁধ অপসারণ কাজে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাকারী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাফফারা তাসনিয়া ও মো. আলী সিদ্দিকী জানান, বাঁধ অপসারণ কাজে স্থানীয় জনগণের সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে না। ঘের মালিকদের ভয়ে এখন স্থানীয় শ্রমিকরাও কাজ করতে অনীহা প্রকাশ করছে বলে তারা অভিযোগ করেন।
ট্যাগস

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Know about Cookies
Ok, Go it!
To Top