জলবায়ু পরিবর্তন, যুদ্ধ-বিগ্রহ, রাজনৈতিক অস্থিরতা প্রভৃতি কারণে সারাবিশ্বে ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসন বাড়িতেছে। বিশেষ করিয়া মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় সহিংসতা ও অস্থিরতায় ইউরোপে অভিবাসনপ্রার্থী ও শরণার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাইতেছে। হতাশা ও জীবনের অনিশ্চয়তার কারণে তাহারা সমুদ্রে পথে অত্যন্ত ঝুঁকির মুখে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ পাড়ি দিতেছে। ইহাতে অনেকের সলিল সমাধির ঘটনা ঘটিতেছে। সর্বশেষ লিবিয়ার ভূ-মধ্যসাগরীয় উপকূলে গত বৃহস্পতিবার প্রায় ৫০০ অভিবাসীবাহী দুইটি নৌকাডুবির ঘটনায় এই পর্যন্ত ১১১ জনের লাশ উদ্ধার করা হইয়াছে। তন্মধ্যে ২৪ জন বাংলাদেশি। বাকিরা সিরিয়া ও সাব-সাহারা আফ্রিকার কয়েকটি দেশের নাগরিক। আশঙ্কা করা হইতেছে, এই ঘটনায় বিভিন্ন দেশের দুই শতাধিক নাগরিক মারা গিয়াছে। অভিবাসনপ্রার্থীদের গন্তব্যস্থল ছিল ইতালি। যদিও বর্তমানে ইউরোজোনের অবস্থা ভাল নয়, তথাপি মন্দের ভাল হিসাবে ও যোগাযোগের সহজ পথ হিসাবে মধ্যপ্রাচ্যের অভিবাসীরা বা শরণার্থীরা ইউরোপকেই বাছিয়া নিতেছে। একই দিন অস্ট্রিয়ায় একটি পরিত্যক্ত ট্রাকে সিরীয় শরণার্থীদের ৭১ লাশ পাওয়া গিয়াছে। অর্থাত্ পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ আকার ধারণ করিয়াছে তাহা এই দুই খবর হইতেই সম্যক উপলব্ধি করা যায়।
জানা যায়, সমুদ্রে ডুবিয়া যাওয়া ঐ দুই নৌকার আরোহীদের মধ্যে মোট ৭৮ জন ছিলেন বাংলাদেশি। তাহারা লিবিয়ার সিরতে শহর ও রাজধানী ত্রিপোলিতে বসবাস করিতেন। কিন্তু সমপ্রতিকালে লিবিয়ার সার্বিক অবস্থা খুবই খারাপ হওয়ায় এবং সেইখানে আইএস-সহ বিভিন্ন জঙ্গি গ্রুপের সশস্ত্র হামলা বৃদ্ধি পাওয়ায় তাহারা ভাগ্য পরিবর্তন ও জীবন বাঁচাইতে ইউরোপে পাড়ি জমাইতেছিলেন। কিন্তু পথিমধ্যে নৌকা ফুটা হইয়া যাওয়ায় তাহারা দুর্ঘটনায় নিপতিত হন। তাহাদের এই প্রাণহানি খুবই মর্মান্তিক ও হূদয়বিদারক। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের মুখপাত্র মেলিসা ফ্লেমিং গত শুক্রবার জানান যে, ঝুঁকিপূর্ণ উপায়ে ভূ-মধ্যসাগর পাড়ি দিয়া চলতি বত্সর তিন লক্ষাধিক শরণার্থী ও অভিবাসী ইউরোপে প্রবেশ করিয়াছে। বিপজ্জনক এই যাত্রার চেষ্টা করিতে গিয়া প্রাণ হারাইয়াছে আরও প্রায় আড়াই হাজার মানুষ। তাহাদের কেহ কেহ অবৈধ উপায়ে সীমান্ত পার হইবার জন্য মানব পাচারকারীদের বড় অঙ্কের অর্থ দিয়াছে। অনুরূপভাবে সহিংসতার কারণে ইরাক ও আফগানিস্তান হইতেও মানুষ ইউরোপের দেশসমূহে পাড়ি দিতেছে। আবার মিয়ানমারে রোহিঙ্গা সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করায় বঙ্গোপসাগর দিয়া ঝুঁকিপূর্ণ পথে শরণার্থী ও অভিবাসনপ্রার্থীরা থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়াসহ প্রভৃতি দেশে পাড়ি দিতেছে। সেইখানেও তাহাদের অনেকে প্রাণ হারাইতেছে এবং মিয়ানমার ও মালয়েশিয়ায় আবিষ্কৃত হইতেছে সেইসব হতভাগ্যদের নূতন নূতন গণকবর। তাহাদের মধ্যে আছে বাংলাদেশিরাও।
অভিবাসী ও শরণার্থীদের এই দুর্দশা একুশ শতাব্দীর সবচাইতে বড় ট্রাজেডি। জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন এই ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করিয়াছেন এবং এই সংকট রাজনৈতিকভাবে সমাধান করিবার জন্য বিভিন্ন রাষ্ট্রের প্রতি আহব্বান জানাইয়াছেন। কিন্তু তাহার এই আহব্বানের মূল সুর হইল মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা। কিন্তু যতক্ষণ না মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিতে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে চলা রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার অবসান না হয়, ততদিন আসলে এই সংকটের কোন সুরাহা হইবে না। পৃথিবীতে যুদ্ধ-বিগ্রহ শুরু ও তাহা জিয়াইয়া রাখিবার জন্য যাহারা প্রকৃতপক্ষে দায়ী, এই ব্যাপারে তাহাদের আগে বোধোদয় হওয়া প্রয়োজন। এই মানবসৃষ্ট সসস্যার সমাধানের পাশাপাশি প্রাকৃতিক কারণে শরণার্থী ও অভিবাসী হওয়া মানুষদের দুঃখ-কষ্ট দূরীকরণেও বিশ্বনেতাদের সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ করিতে হইবে।
