কুমিল্লায় হারিয়ে যাচ্ছে নজরুলের অনেক স্মৃতি

S M Ashraful Azom
বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার কুমিল্লায় পালিত হয়েছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৩৯তম মৃত্যুবার্ষিকী। দিবসটি উপলক্ষে কুমিল্লা জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বৃহস্পতিবার ভোরে জেলা প্রশাসক মো. হাসানুজ্জামান কল্লোলের নেতৃত্বে প্রশাসনের কর্মকর্তাগণ, নজরুল ইন্সটিটিউট কেন্দ্র-কুমিল্লা ও নজরুল পরিষদসহ অন্যান্য সংগঠনের নেতৃবৃন্দ জেলা শিল্পকলা একাডেমি সংলগ্নে ‘চেতনায় নজরুল’ স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন। এছাড়া বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন আলোচনা সভা, কবিতা আর নজরুল সঙ্গীতানুষ্ঠানের মাধ্যমে কবি নজরুল স্মরণে বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালন করে।
 
কুমিল্লায় হারিয়ে যাচ্ছে কবি নজরুলের অনেক স্মৃতি:
 
শিক্ষা-সংস্কৃতির পাদপীঠখ্যাত দেশের প্রাচীনতম জেলা কুমিল্লা জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ১৯২১ সাল থেকে ১৯২৪ সাল পর্যন্ত কুমিল্লায় তিনি পাঁচ বারে ১১ মাস অবস্থান করেছিলেন। কবির বিয়ে থেকে শুরু করে দুই দফায় গ্রেফতার হন কুমিল্লায়। প্রেম, বিয়ে, ব্যক্তিজীবন, সঙ্গীত ও সাহিত্যসহ জুড়ে আছে তার অম্লাণ অনেক স্মৃতি। প্রমীলা দেবীর বাড়ি, ধর্মসাগরের পশ্চিম পাড়ে কবিতা গানের আসর, বসন্ত স্মৃতি পাঠাগার, ঝাউতলায় গ্রেফতার হওয়া, নানুয়া দীঘির পাড়, দারোগা বাড়ি, ইউছুফ স্কুল রোড, মহেশাঙ্গণ, কুমিল্লা বীরচন্দ্র নগর মিলনায়তন ও মাঠ, দক্ষিণ চর্থায় নবাব বাড়ি, শচীন দেব বর্মনের বাড়ি, ধীরেন্দ্র নাথ দত্তের বাড়ি, নজরুল অ্যাভিনিউ (ফরিদা বিদ্যায়তনের সামনে), কান্দিরপাড়, ঝাউতলা, রেল স্টেশন, কোতয়ালী থানা, কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগার এবং মুরাদনগরের দৌলতপুরসহ কুমিল্লা মহানগরীর বিভিন্ন স্থানে কবির স্মৃতি চিহ্ন ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। অবশ্য এসব ফলকের বেশিরভাগই এখন পড়ে আছে অবহেলা-অনাদরে। 
 
১৯৪৫ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে কুমিল্লায় জাতীয় কবি কাজী নজরুলকে কেন্দ্র করে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড শুরু হয় বলে স্থানীয় নজরুল গবেষকদের কাছ থেকে জানা গেছে। তারা জানান, দেশ বিভাগের পর কুমিল্লায় ব্যাপকভাবে শুরু হয় নজরুল চর্চা। এর আগে ১৯২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কুমিল্লা শহরের লাকসাম রোডের পূর্ব পার্শ্বস্থ ঈশ্বর পাঠশালায় কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে নজরুলের বিদ্রোহী কবিতা আবৃত্তি ও নজরুল সঙ্গীত পরিবেশন করা হয়। ১৯৬২ সালে শহরের প্রাণকেন্দ্র কান্দিরপাড় থেকে নজরুল অ্যাভিনিউস্থ ফরিদা বিদ্যায়তন পর্যন্ত সড়কটির নামকরণ করা হয় নজরুল এভিনিউ। ১৯৮৩ সালে কুমিল্লার তত্কালীন সাহিত্যপ্রেমী জেলা প্রশাসক সৈয়দ আমিনুর রহমানের উদ্যোগে কুমিল্লা শহরের যেসব স্থানে কবি নজরুলের পদচারণা ছিল এবং যেসব স্থানে তিনি কবিতা-গান রচনা ছাড়াও গানের আসর নিয়ে বসতেন সেসব স্থানে টিনের স্মৃতিফলক স্থাপন করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৯২ সালে জেলা প্রশাসক মো. হেদায়েতুল ইসলাম চৌধুরীর উদ্যোগে কবি নজরুলের অবস্থান ও তাকে ঘিরে সংশ্লিষ্ট স্থানের সংক্ষিপ্ত ঘটনার বর্ণনা সম্বলিত পাকা স্মৃতিফলক স্থায়ীভাবে স্থাপন করা হয়। এসব স্মৃতিফলকের মধ্যে শহরের নজরুল অ্যাভিনিউ সড়কের উত্তর পার্শ্বের ফলক এবং কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজসংলগ্ন রাণীর দীঘির পশ্চিম-দক্ষিণ কোণের নজরুল স্মৃতি ফলক সম্প্রতি কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে আধুনিকায়ন করে সংরক্ষণ করা হয়েছে। কবি’র শ্বশুরবাড়ি অর্থাত্ ইন্দ্রকুমার সেনের বাড়ির সামনে রয়েছে আরো একটি ফলক। এ ফলকের উত্তর পার্শ্বে ফরিদা বিদ্যায়তনের সামনের ফলকটি সবসময় মাইক্রোবাস, এম্বুলেন্স আর রিক্শার আড়ালে পড়ে থাকে। নির্মাণাধীন বহুতল ভবনের যাঁতাকলে এখনো কোনরকমে টিকে রয়েছে নগরীর ঝাউতলা এলাকায় উকিল যোগেন্দ্র চন্দ্রের বাড়ির সামনের ফলকটি। নগরীর দারোগাবাড়ি মাজার সংলগ্ন যে বাড়িতে কবি গানের আসরে বসতেন সেখানে বাড়ির বারান্দার ভেতরের দেয়ালে স্থাপিত ফলক ও মুরাদপুর জানে আলম চৌধুরী বাড়ির দেয়ালে স্থাপিত ফলকটিও এখন দর্শনার্থীদের তেমন চোখে পড়ে না। নগরীর দক্ষিণচর্থায় উপ-মহাদেশের খ্যাতনামা সঙ্গীতসাধক শচীনদেব বর্মনের বাড়িতে রয়েছে নজরুল স্মৃতিফলক। নগরীর রাজগঞ্জ সড়কের যেখান থেকে কবি নজরুল পুলিশের হাতে প্রথম আটক হয়েছিলেন সেখানে একটি স্মৃতিফলক স্থাপন করা হয়েছিল, বর্তমানে ওই ফলকটির অস্তিত্ব নেই। জেলার সাংস্কৃতিক অঙ্গণের নেতৃবৃন্দ কবি নজরুলের সবগুলো স্মৃতিফলক দৃষ্টিনন্দন করে স্থাপন ও সংরক্ষণ করার দাবি জানিয়েছেন। তারা জানান, নজরুলের ছবি দিয়ে বিলবোর্ড আকারে তথ্য সমৃদ্ধ স্মৃতিফলক স্থাপন করা গেলে দেশ-বিদেশের পর্যটকরা কুমিল্লাকে ঘিরে কবি নজরুল সম্পর্কে বেশি জ্ঞান লাভ করতে পারতো এবং আগামী প্রজন্মও উপকৃত হতো।
 
নজরুল ইন্সটিটিউট কেন্দ্র-কুমিল্লা:
 
২০১৩ সালের ২০ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কুমিল্লা নগরীর ধর্মসাগরের উত্তরপাড়ে নজরুল ইন্সটিটিউট কেন্দ্র-কুমিল্লার উদ্বোধন করেন। এতে নজরুল গবেষণায় নতুন প্রজন্ম উপকৃত হচ্ছেন। এখানে লাইব্রেরি, জাদুঘর, বিক্রয় কেন্দ্র, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মিলনায়তন এবং সঙ্গীত-আবৃত্তি প্রশিক্ষণ কোর্স ও গবেষণা কার্যক্রম চলছে। প্রতি কার্যদিবস সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকে। প্রতিদিন অসংখ্য পাঠক-পাঠিকা লাইব্রেরিতে স্টাডি করতে আসেন। এখানে লোকবল রয়েছে ৫ জন।
 
নজরুল পরিষদের কর্মসূচি:
 
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৩৯তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে জেলা নজরুল পরিষদ বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অশোক কুমার বড়ুয়া জানান, ‘শনিবার (২৯ আগস্ট) প্রত্যুষে নজরুল পরিষদের উদ্যোগে ‘চেতনায় নজরুল’ স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হবে। এদিন সকাল ১০টায় নজরুল ইন্সটিটিউট কেন্দ্রে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি থাকবেন নজরুল পরিষদের সভাপতি ও কুমিল্লার জেলা প্রশাসক মো. হাসানুজ্জামান কল্লোল। পরে নজরুল স্মরণে কবিতা, হামদ-নাত ও অন্যান্য কর্মসূচি পালনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।’
ট্যাগস

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Know about Cookies
Ok, Go it!
To Top