*বোমায় ধসে গেছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর রাজনৈতিক অফিসের ছাদ *১০ পুলিশসহ ধ্বংসস্তূপের নিচে অনেকে আটকা *লস্কর-ই-জাংভির দায় স্বীকার
পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কর্নেল (অব:) সুজা খানজাদা আত্মঘাতী বোমা হামলায় নিহত হয়েছেন। তার সঙ্গে আরো ১৮ জন নিহত হয়েছে। গতকাল রবিবার তার রাজনৈতিক অফিসে এই হামলা চালানো হয়। ভবনটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে এবং অনেকে এর নীচে চাপা পড়েছে। মৃতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে উদ্ধারকর্মীরা। পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. সৈয়দ এলাহি সুজার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন। এই হামলার দায় স্বীকার করেছে নিষিদ্ধ জঙ্গি গোষ্ঠী লস্কর-ই-জাংভি। সুজার মৃত্যুতে পাকিস্তানের জঙ্গি বিরোধী অভিযান বড় ধরনের ধাক্কা খেল বলে বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন।
যেভাবে হামলা
পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় এবং প্রভাবশালী প্রদেশ পাঞ্জাবের এই মন্ত্রীর ওপর গতকাল সকালে যখন হামলা হয়, তিনি তখন তার নিজ জেলা অ্যাটকের শাদি খাল গ্রামে তার রাজনৈতিক কার্যালয়ে জিরাগার (উপজাতীয়দের কাউন্সিল) বৈঠক করছিলেন। এসময় কেউ একজন শরীরে বাধা বোমার বিস্ফোরণ ঘটান। পুলিশ জানিয়েছে, বোমাটি ছিল খুবই শক্তিশালী। বিস্ফোরণে বাড়িটির ছাদ পুরোপুরি ধসে পড়ে। ভবনটির পুরো অবকাঠামো ভেঙে যায়। আহত হয় ২৩ জন। তাদেরকে ইসলামাবাদ এবং রাওয়ালপিন্ডির বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, ভবনটিতে ৫০ থেকে ১০০ জন অবস্থান করছিলেন। নিহতদের মধ্যে ডেপুটি পুলিশ সুপার হাজরো সৈয়দ শওকতও রয়েছেন। এছাড়া আরো ১০ জন পুলিশ কর্মকর্তাসহ ২০ থেকে ২৫ জন ধ্বংসস্তূপের নীচে আটকা পড়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে সেখানে কতজন ছিলেন তা নির্দিষ্ট করে কেউ বলতে পারেননি।
ধ্বংসস্তুূপের নীচে চাপা পড়েন মন্ত্রী সুজা খানজাদাসহ আরো অনেকে। অনেকক্ষণ আশা করা হচ্ছিল যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে হয়তো জীবিত উদ্ধার করা যাবে। কিন্তু ক্রমেই সেই আশা ক্ষীণ হয়ে পড়ে এবং অবশেষে তার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। ময়না তদন্তের জন্য তার মরদেহ রাওয়ালপিন্ডিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তার মৃত্যুতে পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ তিন দিনের শোক ঘোষণা করেছেন। রাওয়ালপিন্ডির পুলিশের আঞ্চলিক প্রধান জানিয়েছেন, এটা ছিল আত্মঘাতী হামলা। প্রত্যক্ষদর্শীরাও হামলাটি আত্মঘাতী ছিল বলে জানিয়েছে।
যে কারণে হামলা
চরম জঙ্গিবিরোধী এই নেতার মৃত্যুতে দেশটিতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পাঞ্জাবে জঙ্গি বিরোধী অভিযানের সঙ্গে সুজা ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। গত মাসেই তিনি ঘোষণা করেন, নিষিদ্ধ সুন্নি দল লস্কর-ই-জাংভি নেতাকে পাঞ্জাবের পুলিশ হত্যা করেছে।
গত বছরের অক্টোবরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পান সুজা খানজাদা। এর আগে তিনি পাঞ্জাবের প্রাদেশিক মন্ত্রী এবং মুখ্যমন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। চলতি বছর তিনি জানিয়েছিলেন, সন্ত্রাসীরা পাঞ্জাবের বিভিন্ন স্কুল, স্থাপনায় হামলাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের হুমকি দিয়েছে। তিনি সকল নিষিদ্ধ সংগঠনের কার্যক্রম চালানোর ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করেছিলেন। এর মধ্যে বিভিন্ন এনজিও এবং মাদ্রাসা ছিল।
পাকিস্তানে বিবিসির সংবাদদাতা শাহজেব জিলানী জানিয়েছেন, খানজাাদার মৃত্যুতে পুরো দেশ যেন মুষড়ে পড়েছে। তিনি একজন সুপরিচিত রাজনীতিক ছিলেন। জঙ্গিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তার ছিল অগ্রণী ভূমিকা। রাজনীতিতেও ছিলেন অত্যন্ত তত্পর। শাহজেব জিলানী বলেন, পাকিস্তানের সেনাবাহিনী এবং রাজনীতিকদের মধ্যে যোগসূত্র হিসাবে কাজ করতেন সুজা। সেই কারণেই হয়তো তাকে টার্গেট করা হয়েছিল।
কট্টর সুন্নিপন্থী জঙ্গি গোষ্ঠী লস্কর-ই-জাংভি এই হামলার দায় স্বীকার করেছে। তারা বলেছে, জুলাইতে তাদের প্রধান নেতা মালিক ইশাক পুলিশের গুলিতে মারা যাওয়ার বদলা নিয়েছে তারা। জিলানী বলেন, তার মৃত্যুতে যে পাকিস্তানের জঙ্গি বিরোধী অভিযান ধাক্কা খাবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তিনি বলেন, খানজাদার ওপর বহুদিন ধরেই হুমকি ছিল। কিন্তু তারপরও তার জন্য যথেষ্ট নিরাপত্তার ব্যবস্থা না করায় নানা প্রশ্ন উঠছে। সুজার মৃত্যুতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চৌধুরী নিসার আলী খানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ এবং সেনাবাহিনী গভীর শোক প্রকাশ করে হামলার চরম নিন্দা জানিয়েছেন। তথ্যসূত্র : ডন, বিবিসি, এক্সপ্রেস ট্রিবিউন ও জিও টিভি

