মানুষ বেঁচে থাকার জন্য যেমন খাদ্যের প্রয়োজন পড়ে তেমনি রোগাক্রান্ত হলে প্রয়োজন চিকিত্সার। তাই হূদরোগের চিকিত্সা হিসেবে প্রচলিত বহুল আলোচিত দুটি পদ্ধতি বাইপাস ও স্ট্যান্টিং। এ দুটিই অপারেশন। আর এই দুই পদ্ধতির চিকিত্সা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ। রোগী সুস্থও হচ্ছেন কিন্তু বেঁচে থাকতে হয় মুঠোয় মুঠোয় ওষুধ সেবন ও বিভিন্ন শারীরিক অক্ষমতা নিয়ে। তার পরেও ভয় থাকে পুনরায় রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কায়।
বিশ্বের এক নম্বর হন্তারক রোগ হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে হূদরোগকে। প্রতি বছর ১৭ দশমিক ৩ মিলিয়ন বা প্রায় পৌনে দু্ই কোটি মানুষ মারা যাচ্ছেন এই রোগে। অন্যদিকে ম্যালেরিয়া, এইচআইভি এইডস এবং যক্ষ্মা—এই তিনটি রোগ মিলে প্রতি বছর গোটা বিশ্বে মারা যাচ্ছেন ৩৮ লাখ মানুষ। অথচ এ তিনটি রোগকেই ভয়ঙ্করভাবে উপস্থাপন করা হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে হূদরোগের ভয়াবহতার ব্যাপারে ব্যাপক প্রচারণা অনুপস্থিত। তাই বিশ্ব হার্ট দিবসে গোটা বিশ্বেই এ বিষয়টির প্রচারণার সুযোগ গ্রহণ করে থাকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
ওয়ার্ল্ড হার্ট ফেডারেশনের ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, ২০১৫ সালের হার্ট দিবসের থিম বা প্রতিপাদ্য হলো—সর্বত্র সবার জন্য পছন্দ করুন সুস্থ হার্ট। ফেসবুকের প্রচারণার কল্যাণে দুহাতের সাহায্যে হার্টের প্রতীক তুলে ধরে সেলফি তোলার হিড়িক পড়ে গেছে দেশে দেশে। গত বছর ২০১৪ সালের হার্ট দিবসের থিম বা প্রতিপাদ্য ছিলো—হার্ট-হেলদি এনভায়রনমেন্ট, বা বলতে পারি সুস্থ হার্ট-বান্ধব পরিবেশ। অর্থাত্ যেখানেই থাকুন সচল থাকুন, হার্ট সুস্থ রাখুন। আমরা যেখানেই বসবাস করি না কেন, আমাদের কর্মক্ষেত্র এবং খেলা বা বিনোদনের স্থান যেখানেই হোক না কেন, তা যেন কোনো ভাবেই হূদরোগের ঝুঁকি না বাড়ায়। সুস্থ হার্ট-বান্ধব পরিবেশ যেন সর্বক্ষেত্রে বজায় থাকে। তাই সকলে মিলেই সুস্থ হার্ট-বান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। সমাজে বিরাজমান হেলথ প্রোগ্রামগুলোর মাধ্যমে ব্যক্তিপর্যায়ে স্বাস্থ্য সচেতনতা গড়ে তুলে সমাজে মৌলিক পরিবর্তন আনার ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। ব্যক্তির জীবনধারার ওপর নির্ভর করে তার হূদরোগের ঝুঁকির বিষয়টি।
আমরা কথায় কথায় বলে থাকি শিশুরা জাতির ভবিষ্যত্। সেই ভবিষ্যত্ সচল রাখার জন্য শিশুর সুস্থ হার্টের দিকে আমাদের বিশেষ দৃষ্টিদানের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। একইভাবে বাংলাদেশের জনসংখ্যার অর্ধেকই নারী, তাই হার্ট সুরক্ষার আন্দোলন ও তত্পরতার বাইরে নারীকে রাখা হলে সেটা হবে আত্মঘাতী। নীরব ঘাতক হূদরোগ থেকে বাঁচতে হলে গোটা জীবন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। বলা যায় সুস্থ হার্ট অর্জন করার জন্যে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করাতে হবে। এবছরের বিশ্ব হার্ট দিবসের মূল ফোকাস বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে অসংক্রামক রোগসমূহের ভেতর হূদরোগকে অন্যতম ভয়াবহ রোগ হিশেবে শনাক্ত করে ২০২৫ সালের ভেতর এসব রোগে মৃত্যুর হার পঁচিশ শতাংশ কমিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে ১৯৪টি দেশে কর্মসূচি প্রণয়নের কথা বলা হয়েছে। বিশ্বের ১৯৪টি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশেও পালিত হতে চলেছে বিশ্ব হার্ট দিবস। আমরা মনে করি, হার্ট দিবস পালন তখনই সার্থক হবে যখন দেশের অপেক্ষাকৃত কম বিত্তবান মানুষ হূদরোগ প্রতিরোধ ও প্রতিকারের আওতায় আসতে পারবে। এজন্য জাতিসংঘ সুস্থ জীবন-যাপনের জন্য বিশেষত হার্ট সুস্থ থাকার জন্য বিকল্প চিকিত্সা হিসেবে যোগ ব্যায়ামকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিয়ে ২১ জুন দিনটিকে বিশ্ব যোগ দিবস পালন করছে। তাই হূদরোগের বিকল্প চিকিত্সার কথাটিও আমাদের স্মরণে রাখতে হবে।
এই বিকল্প চিকিত্সাকে হলিস্টিক চিকিত্সা বলা হয়। হলিস্টিক চিকিত্সা হলো আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রাচীনতম প্রাকৃতিক পদ্ধতির আশ্চর্য সমন্বয়। এই চিকিত্সার মূল চাবিকাঠি দুটি। স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাস এবং ব্যায়াম। রোগীর বয়স এবং রোগের ধরন এবং তার বর্তমান অবস্থার ওপরই নির্ভর করে তার প্রতিদিনের খাদ্যগ্রহণ। আর ব্যায়ামের ব্যাপারটি বিবিধ। তার আগে মন নিয়ন্ত্রণের জন্যে চাই সঠিক উপায়ে মেডিটেশন। মানসিক চাপই মানুষের অসুখ ও অশান্তির মূল কারণ। মানসিক চাপ কমানোর বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মহাজাগতিক শক্তি থেকে জ্যোতি বা প্রাণরস আহরণের কথাও বলা হয়ে থাকে। এসব অর্জনের কাজটি কিন্তু অত সহজ নয়। তার জন্যে নিয়মিত সময় দিতে হয়, চর্চা করতে হয় সঠিক নিয়ম মেনে। যোগব্যায়াম, প্রাণায়াম, মেডিটেশন ও নিউরোবিক জিম—প্রত্যেকটিরই নিজস্ব রীতিনীতি আছে। হলিস্টিক চিকিত্সায় সোল-মাইন্ড-বডি বা আত্ম-মন-দেহ সব কিছুর ওপরেই লক্ষ্য রেখে প্রোগ্রাম দেয়া হয়। সংক্ষেপে বলতে পারি হলিস্টিক চিকিত্সা ইতোমধ্যে দেশে আস্থা অর্জন করেছে। বিগত আট বছর যাবত্ দেশে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে হাজার হাজার হূদরোগীর জীবনে সুবাতাস বয়ে এনেছে।
অধিকাংশ ব্যক্তি মনে করেন করোনারী আর্টারিতে একবার ব্লক হতে শুরু করলে এর গতি আর পাল্টানো যায় না। এর একমাত্র চিকিত্সা এনজিওপ্লাস্টি বা বাইপাস সার্জারি। আমাদের দেশের লক্ষ লক্ষ হূদরোগী যারা এ রোগ নিরাময়ের জন্য প্রচুর টাকা ব্যয় করে বাইপাস অপারেশন করেছেন বা অনেকে বিদেশে যাচ্ছেন, আবার অনেকের পুনরায় হূদরোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে, তারা উপরোক্ত পদ্ধতি অনুসরণ করে সুস্থ ও পরিপূর্ণ জীবন পেতে পারেন। এখনই সময় নিজের জীবনধারায় কিছু নিয়ন্ত্রণ এনে ভবিষ্যতকে হাতের মুঠোয় নিয়ে আসা। একবার কষ্ট করে পরিবর্তনের ধারায় এলে পরে আর সেটা কষ্টসাধ্য হবে না।
বিশ্ব হার্ট দিবসে আমরা অবশ্যই হূদয়ের কথা শুনবো। ফিরে তাকাবো আমাদের হার্টের সুস্থতার দিকে। হার্ট সুস্থ রাখার জন্য যা যা করা দরকার তা করতে সচেষ্ট হবো। প্রচলিত চিকিত্সার পাশাপাশি বিকল্প চিকিত্সার দিকটিও আমাদের তুলে ধরতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তির যুগে তথ্যভাণ্ডার উন্মুক্ত করে দিতে হবে মানুষের সামনে। হূদরোগ থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য সচেতনভাবেই চিকিত্সা গ্রহণ করতে হবে। মধ্যবিত্ত, অসচ্ছল এবং দরিদ্র হূদরোগীরা যাতে যথার্থ চিকিত্সার বাইরে না থেকে যায় সেটাই আজকের প্রধান বিবেচ্য।

