রক্তের বিলিরুবিন সম্পর্কে কিছু তথ্য

S M Ashraful Azom
গিলবার্ট সিনড্রোম ও ক্রিগলার-ন্যাজার সিনড্রোম হয় বিলিরুবিন প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজে জড়িত এনজাইমের মিউটেশনের ফলে। এর মধ্যে গিলবার্ট সিনড্রোমের রোগীদের সংখ্যা বেশী। প্রায় ১০০ জন রোগীর মধ্যে ২-৫ জনের শরীরে এই রোগ পাওয়া যায়। গিলবার্ট সিনড্রোমে উক্ত এনজাইমটি ত্রুটিপূর্ণভাবে কিছুটা কাজ চালিয়ে যেতে পারে। ফলে রক্তে বিলিরুবিনের মাত্রা খুব বেশী বাড়ে না। এছাড়াও প্রক্রিয়াজাত বিলিরুবিন স্বল্প মাত্রায় হলেও প্রস্তুত হয় বিধায় মল ও মূত্রের স্বাভাবিক হলদে রংটি  বজায় থাকে। সাধারণত খুব পরিশ্রম, ক্লান্তি এবং দীর্ঘক্ষণ উপোসের ফলে রক্তে বিলিরুবিনের মাত্রা বাড়তে পারে। এই রোগের লক্ষণ হলো, চোখের হালকা হলুদ রং এবং গাঢ় প্রস্রাব। রোগের লক্ষণ স্কুল-লাইফ থেকে শুরু হলেও মনোযোগে আসে কলেজে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠে। আক্রান্ত ব্যক্তি লিভার প্রদাহ জনিত জন্ডিস মনে করে উদ্ব্বিগ্ন থাকে এবং পুনঃপুনঃ ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়। কিন্তু, পরীক্ষা  নিরীক্ষা করলে রক্তে বিলিরুবিনের মাত্রা হালকা বেশী ছাড়া অন্য কোন সমস্যা ধরা পড়ে না। গিলবার্ট সিনড্রোম একটি জেনেটিক রোগ বিধায় এটার চুড়ান্ত নিরাময় সম্ভব নয়। রোগীদের দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকা এবং ক্ষুধার্ত অবস্থায় অত্যধিক ভারী কাজ করা থেকে বিরত থাকা দরকার। গিলবার্ট সিনড্রোম দীর্ঘমেয়াদে কোন সমস্যা তৈরী করে না বিধায় এটা নিয়ে দুঃশ্চিন্তা করার প্রয়োজন নেই।
 
ক্রিগলার-ন্যাজার সিনড্রোম
 
ক্রিগলার-ন্যাজার সিনড্রোম-কে সংশ্লিষ্ট এনজাইমের কার্যকারিতার উপর ভিত্তি করে দু’ভাগে ভাগ  করা হয়। রোমান অক্ষরে এদেরকে যথাক্রমে টাইপ-১ (ওয়ান) ও
 
টাইপ-২ (টু) বলা হয়। টাইপ ওয়ান-এ সংশ্লিষ্ট এনজাইম পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায় এবং টাইপ টু-তে  উক্ত এনজাইম প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়ে। ফলে দু’ধরণের রোগেই রক্তে বিলিরুবিন অনেক বেশী বেড়ে যায়। এটি খুবই বিরল রোগ। রোগীদের সংখ্যা প্রতি দশ লাখে একজন। রোগের লক্ষণ সদ্যোজাত শিশু থেকেই সপষ্ট হয়। এই রোগে রক্তের অতিরিক্ত বিলিরুবিন মস্তিষ্কে জমা হয়ে কার্নিকটেরাস নামক একটি জটিল রোগ তৈরী করে যাতে মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্থ হয় ও শ্রবণক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যু হয়। সদ্যজাত শিশুদের ক্ষেত্রে সমস্যাটি বেশী হয়। ফোটোথেরাপী ও এক্সচেঞ্জ ট্রান্সফিউশনের মাধ্যমে কার্নিকটেরাস থেকে সাময়িক মুক্তি সম্ভব। এজন্য জন্মের পর পর শিশুদের শরীর মাত্রাতিরিক্ত হলুদ মনে হলে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের পরামর্শ গ্রহণ করা দরকার।
 
তরুণ ও প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে রোগের মূল লক্ষণ হলো জন্ডিস। তবে প্রস্রাবের রং হলুদ হয় না। গিলবার্ট সিনড্রমের মত এই রোগেও দীর্ঘক্ষণ উপোস থাকা, অত্যধিক ভারী কাজ পরিহার করতে হয়। ক্রিগলার ন্যাজার টাইপ ওয়ান-এ যেহেতু এনজাইম পুরোপুরি অকার্যকর, সেহেতু লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টই হল এর একমাত্র চিকিত্সা। তবে ট্রান্সপ্ল্যান্ট তরুণ বয়সে করতে হয়। কেননা, তরুণ বয়সের পর ফোটোথেরাপী কার্যকারিতা হারায়। ফলে মস্তিষ্ক আক্রান্ত হয়ে রোগীরা মারা যায়। অন্যদিকে টাইপ টু-তে প্রাপ্ত বয়স্কদের ক্ষেত্রে বিলিরুবিনের মাত্রা কমিয়ে রাখার জন্য ফেনোবারবিটোন ওষুধ দেয়া হয়। এই রোগে সাধারণত কার্নিকটেরাস ব্যতীত অন্য কোন জটিলতা হয় না।     
 
ডুবিন-জনসন ও রোটোর সিনড্রোম
 
ডুবিন-জনসন সিনড্রোম ও রোটোর সিনড্রোম হয় প্রক্রিয়াজাত বিলিরুবিনকে লিভার কোষ থেকে ক্ষুদ্র পিত্তনালীতে (বাইল ক্যানালিকুলি) নিঃসরণের সাথে জড়িত প্রোটিনে মিউটেশনের ফলে। যেহেতু লিভার প্রক্রিয়াজাত বিলিরুবিনকে ক্ষুদ্রান্তে নিঃসরণ করতে পারে না, ফলে রক্তে বিলিরুবিন বেড়ে যায় এবং জন্ডিস দেখা দেয়। এই রোগদ্ব্বয়ও খুব অল্প মানুষে দেখা যায়। এই রোগে জণ্ডিস ব্যতীত অন্য কোন লক্ষণ সাধারণত দেখা যায় না। চোখ হলুদ হওয়ার পাশাপাশি, প্রস্রাবের রংও হলুদ হয়ে থাকে। গর্ভধারণ করলে, জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি খেলে এবং অন্য কোন রোগের সময় জন্ডিসের মাত্রা বাড়তে পারে।  গিলবার্ট সিনড্রোমের ও ক্রিগলার-ন্যাজার সিনড্রোমের ন্যায় এই রোগদ্ব্বয়েরও মূল চিকিত্সা হচ্ছে সচেতনতা। দীর্ঘমেয়াদে এই রোগদ্ব্বয় মূলত: অন্য কোন জটিলতা তৈরী করে না। এই রোগে লিভারের রং কালো বর্ণ ধারণ করে।
 
জন্ডিস হলে তথা রক্তে বিলিরুবিন বেড়ে গেলে করণীয়
 
উপরে আমরা রক্তে বিলিরুবিন বেড়ে যাওয়ার জন্মগত কারণ সম্পর্কে অবগত হলাম। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি খেয়াল রাখা দরকার তা হলো জন্ডিস-এর প্রধান কারণ ভাইরাল হেপাটাইটিস। সুতরাং কোন শিশু বা ব্যক্তির জন্ডিস দেখা দিলে চিকিত্সকরা প্রথমেই পরীক্ষা নিরীক্ষা করে নিশ্চিত হয়ে নেন যে, সেটা কোন ভাইরাস জনিত লিভার প্রদাহের কারণে হয়েছে কিনা। যাদের লিভার সিরোসিস আছে তাদের ক্ষেত্রে জন্ডিস চলে আসা রোগ অবনতির লক্ষণ। এ কারণে প্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে জন্ডিস হলে তাদের লিভার সিরোসিস আছে কিনা তাও যাচাই করে নেয়া হয়। এছাড়াও
 
নানাবিধ কারণে দীর্ঘমেয়াদী লিভার প্রদাহ, লিভার ক্যান্সার, পিত্তথলীতে পাথর, পিত্তনালীর টিউমার, প্যানক্রিয়াসের টিউমার ইত্যাদি কারণেও রক্তে বিলিরুবিন বেড়ে যায়। মূল কথা হলো, যেহেতু অধিকাংশ ক্ষেত্রে উপরোক্ত রোগগুলোই জন্ডিসের মূল কারণ, সেহেতু কোন রোগীর কনজেনিটাল হাইপারবিলিরুবিনেমিয়া হয়েছে চিন্তা করার আগে জন্ডিসের জন্য দায়ী সাধারণ তথা কমন রোগগুলো যে নেই তা নিশ্চিতভাবে যাচই করে নিতে হবে।
 
রোগীদের জন্য উপদেশ 
 
আলোচ্য প্রবন্ধে আমরা রক্তে বিলিরুবিন বেড়ে গিয়ে জন্ডিস হওয়ার কিছু জন্মগত কারণ সমপর্কে জানতে পারলাম। যদিও রোগগুলোতে প্রায়ই চোখ হলুদ থাকে বলে মনে উদ্বেগ সৃষ্টি হয় তথাপি স্বস্তির বিষয় হলো, অধিকাংশ রোগগুলো দীর্ঘমেয়াদে কোন জটিল শারীরিক সমস্যা তৈরী করে না। কিছু সাধারণ উপদেশ মেনে চললে পুনঃ পুনঃ জণ্ডিস হওয়ার প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা যায়। এছাড়া, আমরা জেনেছি, কনজেনিটাল হাইপারবিলিরুবিনেমিয়ার অন্তর্ভুক্ত রোগগুলোর মধ্যে গিলবার্ট সিনড্রোম তুলনামূলকভাবে বেশী হতে দেখা যায়। গিলবার্ট সিনড্রোমের লক্ষণ জন্ডিস এবং তা ক্লান্তি, দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকা ইত্যাদি অবস্থায় লক্ষ্য করা যায়।    
 
অতএব, আমাদের আত্মীয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধবদের মধ্যে কেউ ঘন ঘন জন্ডিস হওয়ার অভিযোগ করলে তাকে আমরা বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের পরামর্শ গ্রহণ করতে উত্সাহিত করব। কেননা, হতে পারে তার ভাইরাল হেপাটাইটিস হয়েছে অথবা হতে পারে তার কোন জেনেটিক রোগের কারণে এরকম হচ্ছে। যে কারণেই হোক না কেন রোগ নির্ণয় করা এবং সচেতনভাবে ও নিয়মানুযায়ী নির্ণিত রোগের চিকিত্সা করা যে কোন ব্যক্তি সুস্থতার পূর্বশর্ত। (শেষ)
 
 
 
লেখক:পরিচালক
 
দি লিভার সেন্টার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
মির্জা গোলাম হাফিজ রোড
 
বাড়ী নং-৬৪, রোড নং-৮/এ
 
ধানমন্ডি, ঢাকা

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Know about Cookies
Ok, Go it!
To Top