কে এই রিটা কাত্জ!

S M Ashraful Azom
বাংলাদেশে সম্প্রতি ইতালি এবং জাপানের দুই নাগরিক হত্যার ঘটনায় ইসলামিক স্টেট বা আইএস দায় স্বীকার করেছে বলে খবর প্রকাশিত হয়। কিন্তু দায় স্বীকারের পর ইতালিক নাগরিককে হত্যার আইএসের বিবৃতিটি প্রত্যাহারও করা হয়। ফলে বিদেশি দুই নাগরিক হত্যার পেছনে আসলে আইএস দায়ী কিনা তা নিয়ে এখনো ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছে। তবে যে ওয়েবসাইটে দায় স্বীকারের বিষয়টি প্রকাশ পেয়েছে সেই প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক রিটা কাত্জকে নিয়ে আছে বিতর্ক। তিনি এর আগেও বিতর্কিত সংবাদ প্রকাশ করেছেন বলে জানা গেছে।
 
গত ২৮ সেপ্টেম্বর রাজধানীর গুলশানে কূটনৈতিক পাড়ায় ইতালির এক নাগরিককে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এরপর বিভিন্ন জঙ্গি গোষ্ঠীর ইন্টারনেটভিত্তিক তত্পরতা নজরদারি করে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এমন ওয়েবসাইট ‘সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ’ এর উদ্ধৃতি দিয়ে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে আইএসের দায় স্বীকার সংক্রান্ত খবর প্রকাশিত হয়। পরে ওয়েবসাইট থেকে আইএসের ওই্ বিবৃতিটি সরিয়ে ফেলা হয়। তবে ৩ অক্টোবর রংপুরে জাপানের নাগরিক হত্যার পর একই দাবি করে আইএস। তবে ওই বিবৃতিটি ওয়েবসাইট থেকে সরানো হয়নি। গতকাল সোমবারও ওয়েবসাইটে গিয়ে ৩ অক্টোবরের আইএসের বিবৃতির সংবাদটি দেখা গেছে।
 
রিটা কােজর ওয়েবসাইটটি নাম ‘সার্চ ফর ইন্টারন্যাশনাল টেররিস্ট এনটিটিস (এস আই টি ই)’। তিনি এই ওয়েবসাইটটির সহ-প্রতিষ্ঠাতা। ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস টাইমসের তথ্যমতে, রিটা কাত্জ ওয়াশিংটন ডিসি ভিত্তিক এই ওয়েবসাইটের নির্বাহী পরিচালক। তিনি গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সন্ত্রাসবাদ এবং জিহাদি সংক্রান্ত কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছেন। উইকিপিডিয়ার তথ্য মতে, রিটা কাত্জ সন্ত্রাসবাদ বিষয়ক একজন বিশ্লেষক। এস আই টি ই একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। এটা বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক ট্র্যাক করে এবং একই সঙ্গে গোপন বার্তা ও ভিডিও প্রচার করে। এছাড়া সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর বিভিন্ন যোগাযোগ নেটওয়ার্ক থেকে তথ্য সংগ্রহ করে সন্ত্রাসীদের আত্মঘাতী বোমা হামলার পূর্বের খবরও প্রচার করে রিটা কােজর ওয়েবসাইট।
 
রিটা কােজর ওয়েবসাইটে প্রচার করা তথ্য বিভিন্ন সময় ভুয়া প্রমাণিত হয়েছে। গত ৫ ফেব্রুয়ারি বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ইনটেল্লিহাব’র ওয়েবাসইটে ‘রিটা কাত্জ ইজ অ্যাট ইট এ্যাগেইন-ফেইক আইসিস ভিডিও এক্সপোজড’ (রিটা কাত্জ ফের আইএসের একটা ভুয়া ভিডিও ছাড়লেন) শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে জানানো হয়, জর্ডানের এক পাইলটকে আইএস সদস্যদের পুড়িয়ে হত্যার করার যে ভিডিও  এস আই টি ই প্রচার করেছে তা ভুয়া। ভিডিওটি ছিল ২২ মিনিটের। এই খবর ওই সময় আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ হয়। জেমস ফোলি নামের এক ব্যক্তিকে আইএস শিরশ্ছেদ করেছে বলে প্রচার করেন রিটা কাত্জ। কিন্তু পরে দেখা যায়, ওই ভিডিওটিও ভুয়া। এমনকি জেমস ফোলির বোন হিসেবে অ্যালেক্সিস ইসরাইল নামের এক মেয়ে পরিচয় দেন। পরে মিসেস ইসরাইল জানান, তিনি আসলে জেমস ফোলির বোন না।
 
কে এই রিটা কাত্জ?
 
উইকিপিডিয়ায় প্রকাশিত তথ্যে দেখা গেছে, রিটা কাত্জ ১৯৬৩ সালে ইরাকের দক্ষিণে বসরা নগরে জন্মগ্রহণ করেন। জন্মহগতভাবে তিনি ইহুদী। ১৯৬৮ সালে সাদ্দাম হোসেনের বাথ পার্টি ক্ষমতায় আসার পর ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ’র হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে তার বাবাকে প্রকাশ্যে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। এরপর তাদের একটি পাথরের তৈরি ছোট্ট ঘরে গৃহবন্দী করা হয়। তাদের সম্পত্তিও বাজেয়াপ্ত করা হয়। একবার সরকার ওই প্রদেশ থেকে চলে যেতে বিনা মূল্যে গাড়ি সরবরাহ করে। তবে রিটা কােজর মা তিন সন্তান নিয়ে পায়ে হেঁটে ইরানে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। সেখান থেকে তারা ইসরাইল চলে যান।
 
রিটা কােজর পরিবার সমুদ্র তীরবর্তী শহর বাট ইয়ামে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। ইসরাইলে অবস্থানের সময় কাত্জ ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বাহিনীতে কাজ করেন এবং একই সময় তিনি তেল আবিব ইউনিভার্সিটিতে রাজনীতি, ইতিহাস, মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ে পড়ালেখা করেন। তিনি বিশ্বাস করেন, ইসরাইলে থাকার অধিকার আছে ইহুদিদের। ১৯৯৭ সালে রিটা কােজর স্বামী যুক্তরাষ্ট্রের স্কলারশিপ পান। তারা তিন সন্তান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। তবে তিনি ওই সময় ভিসা জালিয়াতি করেন বলে স্বীকার করেন। ওই বছরই যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক গবেষণা ইনস্টিটিউটে কাজ শুরু করেন তিনি।  হোলিল্যান্ড ফাউন্ডেশনে নামের একটি গ্রুপ ফিলিস্তিনের হামাসের পক্ষে কাজ করছে এমন তথ্য উদঘাটন করেন রিটা। এরপর গোয়েন্দাগিরিতে রিটার কদর বেড়ে যায়। তিনি বোরকা পরে মুসলিম নারীর ছদ্মবেশে ইসলামি সম্মেলন এবং তহবিল সংগ্রাহকদের কাছে ঘুরে বেড়ান। এসময় তার শরীরে শব্দ রেকর্ডিং যন্ত্রও লাগানো থাকতো। তিনি মসজিদে গিয়েছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রে ফিলিস্তিনদের সঙ্গে বিভিন্ন আন্দোলনেও অংশ নিয়েছেন। তার লক্ষ্য ছিল আমেরিকার ইসলামি দলগুলোর সঙ্গে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের যোগাযোগ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা। ২০০২ সালের জুলাইয়ে জোশ ডেভনের সঙ্গে এস আই টি ই ইনস্টিটিউট গড়ে তোলেন। এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে বিভিন্ন ফেডারেল এজেন্সি এবং প্রাইভেট গ্রুপ সহায়তা করে।
ট্যাগস

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Know about Cookies
Ok, Go it!
To Top