বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে সিসমিক (ভূতাত্ত্বিক) জরিপের জন্য নতুন করে দরপত্র আহ্বান করার উদ্যোগ নিয়েছে পেট্রোবাংলা। একইসঙ্গে এ কাজের জন্য আগের দরপ্রস্তাব বাতিল করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত দেশের সমুদ্রবক্ষে আবিষ্কৃত একমাত্র গ্যাসক্ষেত্র সাঙ্গুর মজুদ শেষ এবং গ্যাসের ক্রমবর্ধমান চাহিদা বৃদ্ধির মধ্যেই সরকার এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল। ফলে ভারত ও মিয়ানমারের সাথে সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ-জটিলতা নিরসন হলেও সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান শুরুর কাজ প্রায় দুই বছর পিছিয়ে গেল।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্র জানায়, বিভাগের টাস্কফোর্সের এক সভায় দেশের সমুদ্রাঞ্চলে অগভীর অংশের পশ্চিমভাগে এবং সম্পূর্ণ গভীর সমুদ্রের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের জন্য ‘মাল্টি-ক্লায়েন্ট সিসমিক সার্ভে’র বিষয়ে আলোচনা হয়। গত ২০ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ঐ সভায় সমুদ্রাঞ্চলে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে জরিপের লক্ষ্যে নতুন করে দরপত্র আহ্বান করতে জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিতে পেট্রোবাংলাকে নির্দেশনা দেয়া হয়।
এ প্রসঙ্গে বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু গত বৃহস্পতিবার বলেন, আগের দরপত্র বাতিল করে পুন:দরপত্র আহ্বান করতে পেট্রোবাংলাকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। আগের দরপত্র বাতিল সম্পর্কে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর দফতরের নির্দেশে এটি করা হয়েছে। সেখান থেকে কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির পর গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বড় আকারে ভূতাত্ত্বিক জরিপ করার উদ্যোগ গ্রহণ করে সরকার। এ জন্য গত ৪ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করে পেট্রোবাংলা। দরপত্র জমা দেয়ার শেষ দিন ২৯ মার্চ পর্যন্ত পাঁচটি দরপ্রস্তাব জমা পড়ে। ওইদিনই দরপত্র উন্মুক্ত করা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এপ্রিলেই নির্বাচিত দরপ্রস্তাবকারীর সাথে চুক্তি করার কথা ছিল। দরপত্র মূল্যায়ন করে নরওয়ের কোম্পানি টিজিএস এবং ফ্রান্সের স্ক্লামবার’র কনসোর্টিয়ামকে কাজ দেয়ার সিদ্ধান্তও চূড়ান্ত করেছিল সংশ্লিষ্ট কমিটি। চুক্তির পর জরিপ শেষ করার সময়সীমা ২০ মাস। জরিপের ফলাফল ইতিবাচক হলে সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে চূড়ান্ত দরপত্র আহ্বান করা হবে। কিন্তু প্রথম দরপত্রে নির্বাচিত ঐ কনসোর্টিয়ামের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর না করে পুন:দরপত্র আহ্বান করায় অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরুতেই হোঁচট খেল।
পেট্রোবাংলার একজন পরিচালক জানান, এ জরিপে বাংলাদেশ কোনো বিনিয়োগ করবে না। জরিপে যে তথ্য পাওয়া যাবে, তার মালিকানা থাকবে জরিপ পরিচালনাকারী কোম্পানির। কোম্পানি তথ্য বিক্রি করে বিনিয়োগের অর্থ তুলে নেবে। খরচ উঠে আসার পর বাংলাদেশ লাভের অংশ পাবে। তিনি জানান, সমুদ্র উপকূল-পরবর্তী ২০ মিটার থেকে আড়াই হাজার মিটার পর্যন্ত জরিপ করা হবে। ১০ বছরের জন্য বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করা হবে। চুক্তি স্বাক্ষর হওয়া কোম্পানি দ্বিমাত্রিক জরিপের মাধ্যমে সমুদ্রবক্ষে গ্যাসের কাঠামো আছে কিনা কিংবা গ্যাস বা তেলের মজুদ থাকার সম্ভাবনা যাচাই করবে। এরপর গ্যাস বা তেলের মজুদ বিষয়ে ত্রিমাত্রিক জরিপ এবং কূপ খনন করে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
প্রসঙ্গত, ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমার বিরোধ নিষ্পত্তির পর প্রায় ১ লাখ ১৯ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমানা নির্ধারণ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে ভারত ও মিয়ানমার নিজ নিজ সীমানায় জরিপ চালিয়ে তেল-গ্যাস মজুদের সন্ধান পেয়েছে। বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায়ও তেল ও গ্যাসসহ বিপুল খনিজ সম্পদ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।

