
সেবা ডেস্ক: রাজধানী ঢাকার সাভারে মাথার চুল বিক্রি করে শিশু খাদ্য কেনা সংক্রান্ত জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে মিথ্যা সংবাদ প্রকাশের ঘটনায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সাংবাদিক নামধারী সাবেক এক জামায়াত নেতা ও সাবেক দুই ছাত্রদল নেতাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন ব্যাংক কলোনির এক বাসিন্দা।
বৃহস্পতিবার ২৩ (এপ্রিল) রাত ৮টায় সাভারের ব্যাংক কলোনি এলাকার বাসিন্দা রমিজউদ্দিন ভুইয়া মিশু বাদী হয়ে সাভার মডেল থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে তিন জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন।
মামলার আসামিরা হচ্ছেন, ফেসবুকে সেইভ সাভার আইডির এ্যাডমিন রাজিব মাহমুদ (৩২), উমর ফারুক (৪০) এবং ওবায়দুর রহমান অভি (৫০)। মামলার বাদী মামলার তথ্য বিবরণীতে উল্লেখ করেন, তার বাড়ির ভাড়াটিয়া সাথি আক্তার দেড় মাস পূর্বে খুশকি জনিত কারণে মাথার চুল ফেলে দেন আর সেই সুযোগটি লুফে নিয়ে গুজব ছড়ানো হয় যে করোনা ভাইরাসের কারণ গৃহবধূ মাথার চুল বিক্রি করেছেন। তিনি দাবি করেন, সারাদেশব্যপী সরকারের ত্রাণ কার্যক্রমের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করতে এমনটি করছেন তারা।
এভাবে স্পর্শকাতর বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তির ধুম্রজাল ছড়িয়ে মিথ্যাচারের মাধ্যমে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্নের চেষ্টা চালানো হয়। ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখে তাৎক্ষণিক ষড়যন্ত্র বলে অভিহিত করেন ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মাসুদ চৌধুরী। রাজনৈতিক চ্যানেলে তিনি বিষয়টি জানান উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে। একই সঙ্গে সরকারের প্রভাবশালী একটি গোয়েন্দা সংস্থা তদন্ত নেমে দেখতে পান ঘটনার অসারতা। ঢাকা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও সরেজমিন তদন্তে এসে দেখা যায়, স্রেফ উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে এই ঘটনাটির “বিশ্বাসযোগ্য” নাটক মঞ্চস্থ করে। সূত্র মতে, পুলিশের একটি গোয়েন্দা সংস্থা ছায়া তদন্ত নেমে রিপোর্ট পেশ করে উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে।
সেখানে বলা হয়, চুল কাণ্ডের প্রধান হোতা রাজিব মাহমুদ সাভার মডেল থানার তালিকাভুক্ত একজন মাদক ব্যবসায়ী ও মাদক মামলায় চার্জশিটভুক্ত আসামি। তার ভাই সাভার পৌর ছাত্রলীগের সাবেক নেতা আহমেদ রুবেল। রুবেল কিছুদিন ব্যাংক কলোনী এলাকায় রেস্টুরেন্ট ব্যবসা করলেও এখন তার আয়ের উৎস সম্পর্কে স্পষ্ট নয়। তার সহোদর রাজিব আহমেদ ছিলেন ছাত্রদলের নেতা। তবে ছাত্রলীগ নেতা ভাই আহমেদ রুবেলের ছত্রছায়ায় সে ভোল পাল্টিয়ে শুরু করেন মাদক ব্যবসা। ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের লেজুড়বৃত্তি করে একের পর এক তোদের কর্মকাণ্ড নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে নিজেকে আলোচনায় আনেন এই রাজিব।
পাশাপাশি গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ মেলামেশার সমাজে ফেসবুকে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ঘটনাবলীর শিরোনাম স্ট্যাটাস হিসেবে দিয়ে নিজেকে পরিচয় দিতেন “সাংবাদিক” হিসেবে। আদতে তিনি সাংবাদিক নন মাদকসেবী। মামলার দ্বিতীয় আসামি রোটারিয়ান ওমর ফারুক কুষ্টিয়ায় ছাত্রশিবিরের নেতা হলেও সাভারে ভোল পাল্টে বনে যান সাংবাদিক। ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় একটি অনিয়মিত ট্যাবলয়েড পত্রিকা প্রকাশের আড়ালে চাঁদাবাজি করাই ছিল তার মূল পেশা। এর আগে তিনি জামায়াত ইসলামীর অর্থায়নে প্রকাশিত দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় বিজ্ঞাপন প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন।
ওই পত্রিকাটির নামে নানা সময় জমকালো অনুষ্ঠান করে বিভিন্ন ব্যক্তিকে সংবর্ধনা ও ক্রেস্ট দেয়ার আড়ালে চলতো তার চাঁদাবাজি ও প্রতারণার ব্যবসা। “সাপ্তাহিক নিউজ গার্ডেন” নামের অনিয়মিত ওই পত্রিকার অন্যতম পৃষ্ঠপোষক এবং পত্রিকার ব্যবস্থাপনা সম্পাদক জসীম উদ্দীন নিজেও একটি হত্যা মামলার আসামি – এমন তথ্যও উল্লেখ করা হয় ওই প্রতিবেদনে। মামলার তৃতীয় আসামি সম্পর্কে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ওবাইদুর রহমান অভি ছিলেন ছাত্রদলের নেতা।
বিএনপি জমানায় পুলিশের খাতায় ছিলেন তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী। সেই জমানাতেই একবার তাকে ক্রসফায়ারে দেয়ার জন্য নেয়া হলেও সে যাত্রায় অলৌকিক ভাবে তিনি প্রাণ নিয়ে ফিরে আসেন। রাজনৈতিক পালাবদলের পর ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় তিনি বনে যান ব্যবসায়ী নেতা। দ্রুত মালিক হন অঢেল ধনসম্পত্তির। এই তিনজনের পরস্পরের যোগসাজশে দেড় মাস আগে এক নারীর চুল কেটে তা বিক্রি করার ঘটনাকে রংচং লাগিয়ে নতুন ঘটনার মোড়কে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে গণমাধ্যমকর্মীদের বিভ্রান্ত করা হয় বলেও উল্লেখ করা হয় ওই প্রতিবেদনে।
আশুলিয়ার একটি বেসরকারি টেলিভিশনের স্থানীয় প্রতিনিধির নাম উল্লেখ করে ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গোয়েন্দাদের জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছিলেন, তিনি এতটাই বিভ্রান্ত হয়েছিলেন যে, ঘুর্নাক্ষরে বুঝতে পারেন নি ঘটনাটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সাজানো। বিষয়টি বুঝতে পারার পর তিনি ফেসবুক থেকে তার প্রচারিত খবরটি সরিয়ে নেন এবং টেলিভিশনের অনলাইন লিংক থেকেও খবরটি সরিয়ে দেয়া হয়। মামলা দায়েরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সাভার মডেল থানার ওসি অফিসার ইনচার্জ (ওসি) এএফএম সায়েদ। মামলা দায়েরের পর লাপাত্তা এই তিন ছাত্রদল ও শিবিরের সাবেক নেতা।
সাভার উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুরুল আলম রাজীব জানান,ছাত্রদল-শিবির নেতাদের যোগসাজশেই সামান্য একটি ঘটনাকে মিথ্যার বেড়াজালে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্টের পাঁয়তারা করা হচ্ছিল। সাভার উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তা পারভেজুর রহমান জুমন জানান, সরকারকে বিব্রত করতে এবং স্থানীয় প্রশাসনকে হেয় করার জন্য কল্পকাহিনী ফেঁদে যে ঘটনার জন্ম দেয়া হয়েছে তা ন্যক্কারজনক। দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সাভার প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক গোবিন্দ আচার্য বলেন, এর আগের বার প্রেসক্লাব থেকে বহিস্কৃত হলেও চলতে কমিটি আসামি ওমর ফারুককে সাভার প্রেসক্লাবের সদস্য পদ দিয়েছে। আসামিরা পরস্পরের যোগসাজশে সাংবাদিকদেরকে বিভ্রান্ত করেছিলেন। এখন মনে হচ্ছে পরিকল্পিতভাবেই তারা কাজটি করেছিলেন। ঘটনার দায় আসামিদের নিজেদের বহন করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
