সেবা ডেস্ক: ইরানের সাথে চলমান সংঘাত দ্রুত শেষ করার ইঙ্গিত দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এদিকে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ।
![]() |
| ইরান যুদ্ধ দ্রুত শেষ করতে চান ট্রাম্প, জ্বালানি নিরাপত্তায় বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা |
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে তিনি ইরানের সাথে চলমান সামরিক সংঘাত খুব তাড়াতাড়ি গুটিয়ে আনতে চাইছেন। পাশাপাশি তার ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টামণ্ডলী একান্ত আলোচনায় এই যুদ্ধ থেকে নিরাপদে বেরিয়ে আসার একটি সম্মানজনক পথ খোঁজার জন্য তাকে তাগিদ দিচ্ছেন। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য লাফিয়ে লাফিয়ে বৃদ্ধি পাওয়া এবং যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে দেশের অভ্যন্তরে বিরূপ রাজনৈতিক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থেকেই এমন পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
গত ৯ মার্চ সোমবার ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প দাবি করেন যে তাদের সশস্ত্র বাহিনীর মূল উদ্দেশ্যগুলোর বেশিরভাগই ইতিমধ্যে সফল হয়েছে। পূর্বনির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে তারা বেশ ভালোভাবেই সামনের দিকে অগ্রসর হয়েছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন। খুব অল্প সময়ের মাঝেই এই সংঘাতের চূড়ান্ত অবসান ঘটবে বলে তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন। তারপরও ঠিক কবে নাগাদ ইরানি ভূখণ্ডে এই আক্রমণের সমাপ্তি টানা হবে, সে ব্যাপারে তিনি সুনির্দিষ্ট কোনো তারিখ বা সময় উল্লেখ করা থেকে বিরত থেকেছেন।
ইরানের ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে আন্দোলনরত সাধারণ নাগরিকদের সাহায্য করার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ট্রাম্পের কথায় স্পষ্ট হয় যে, তিনি দ্রুত যুদ্ধ থামাতে বেশি ইচ্ছুক এবং সেখানে সরকার পতনের জন্য অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগে তার বিশেষ আগ্রহ নেই। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, তারা এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান খুঁজছেন যা আগামী অনেক বছর শান্তি বজায় রাখবে, অন্যথায় পরিস্থিতি এখনই থামিয়ে দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে। সদ্য নিহত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির স্থলাভিষিক্ত হিসেবে তার পুত্র মোজতবা খামেনিকে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার পদে বসানোয় তিনি তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তার দৃষ্টিকোণ থেকে এই নিয়োগের মাধ্যমে তেহরান প্রশাসন প্রমাণ করেছে যে তারা কোনোভাবেই নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসতে প্রস্তুত নয়।
ট্রাম্পের মন্ত্রিসভার কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা মনে করেন, ইরান যদি আশপাশের রাষ্ট্রগুলোতে আক্রমণ অব্যাহত রাখে এবং ইসরায়েলও পাল্টা হামলা চালাতে বদ্ধপরিকর থাকে, তবে চাইলেই ওয়াশিংটনের পক্ষে এই যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে যাওয়া সম্ভব হবে না। ট্রাম্প তার বক্তব্যে পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে, ইরান যদি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটানোর চেষ্টা করে, তবে মার্কিন বাহিনী তাদের আক্রমণ চালিয়ে যেতে বাধ্য হবে। উল্লেখ্য যে, এই সামুদ্রিক পথটি গোটা বিশ্বের তেল বাণিজ্যের জন্য একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও প্রধান মাধ্যম।
হোয়াইট হাউসের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, নিজেদের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় থাকার পরও একটি সম্মানজনক বিজয়ের ঘোষণা দিতে না পারা অবধি ট্রাম্প কিছুতেই এই যুদ্ধ থামাবেন না। বিভিন্ন গোপন সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ওয়াশিংটন এবং তেল আবিবের যৌথ বাহিনীর লাগাতার বোমাবর্ষণের পরেও তেহরান কেন হার মানছে না, তা ভেবে ট্রাম্প নিজেও মাঝেমধ্যে বেশ অবাক হচ্ছেন। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের বাসভবনের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট ট্রাম্পের যুদ্ধ শেষ করার খবর সংক্রান্ত প্রতিবেদনগুলোর কড়া সমালোচনা করেছেন। তিনি দাবি করেন যে এসব সংবাদ ভিত্তিহীন তথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে এবং যারা এই খবরগুলো ছড়াচ্ছে তারা কখনোই প্রেসিডেন্টের একান্ত বৈঠকগুলোতে উপস্থিত থাকার সুযোগ পায় না।
তিনি নিশ্চিত করেন যে ট্রাম্পের প্রধান পরামর্শকরা অপারেশন এপিক ফিউরি নামের এই সামরিক অভিযানকে সাফল্যের মুখ দেখাতে দিনরাত এক করে কাজ করে যাচ্ছেন। এই সশস্ত্র সংঘাত ঠিক কবে নাগাদ থামবে, সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত একমাত্র সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান হিসেবে প্রেসিডেন্ট নিজেই গ্রহণ করবেন। তবে যুদ্ধকেন্দ্রিক ট্রাম্পের বিভিন্ন সময়ের কথাবার্তায় বেশ কিছু পরস্পরবিরোধী মন্তব্যও বিশেষজ্ঞদের নজরে এসেছে।
মাত্র এক সপ্তাহ আগেই তিনি ইরানের পুরোপুরি হার মানার দাবি তুলেছিলেন এবং সেখানে মার্কিন পদাতিক বাহিনী পাঠানোর চিন্তাও উড়িয়ে দেননি। অথচ সোমবার নিউইয়র্ক পোস্ট পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান যে, তিনি স্থল অভিযানের মতো কোনো আদেশ দেওয়ার কথা একেবারেই ভাবছেন না। তিনি একমুখে যুদ্ধ দ্রুত থামার কথা বলছেন, আবার পরক্ষণেই বলছেন যে তারা চাইলে এই অভিযানকে আরও বহুদূর পর্যন্ত নিয়ে যেতে সক্ষম। বর্তমান এবং সাবেক একাধিক মার্কিন নীতিনির্ধারক জানিয়েছেন যে, ট্রাম্প প্রকাশ্যে ও গোপনে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে ইরান যদি আমেরিকার শর্তগুলো মেনে না নেয়, তবে নতুন নেতা মোজতবাকে হত্যার বিষয়টিও তার সমর্থন পেতে পারে।
বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামে ব্যাপক উত্থান-পতনের ঠিক এমন একটি সংকটময় মুহূর্তেই ট্রাম্পের তরফ থেকে এমন মন্তব্যগুলো বেরিয়ে আসছে। এর ফলে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের বিপুল আর্থিক ব্যয় এবং দেশের ভেতরের রাজনৈতিক অসন্তোষ নিয়ে খোদ ট্রাম্পের রাজনৈতিক সঙ্গীরাই চিন্তায় পড়ে গেছেন। ট্রাম্পের কাছের লোকেরা অত্যন্ত দুশ্চিন্তার সাথে খেয়াল করেছেন যে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের মূল্য একশ ডলারের ঘর অতিক্রম করেছে। এই মূল্যবৃদ্ধির কারণে সামনে থাকা মধ্যবর্তী নির্বাচনের সম্ভাব্য নেতিবাচক ফলাফলের কথা ভেবে বেশ কয়েকজন রিপাবলিকান রাজনীতিক সরাসরি ফোন করে তাদের শঙ্কার কথা জানিয়েছেন। প্রেসিডেন্টের অর্থনীতি বিষয়ক পরামর্শক স্টিফেন মুর স্মরণ করিয়ে দেন যে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে তার প্রভাব নিত্যপ্রয়োজনীয় সব জিনিসের ওপরই গিয়ে পড়ে। তিনি উল্লেখ করেন যে সাধারণ মানুষের কেনাকাটার সামর্থ্য এমনিতেই তলানিতে ঠেকেছে, আর বর্তমান পরিস্থিতি একটি ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের এই চলমান সংঘাতের মাঝে ইরাকের মাটি যেন কোনোভাবেই আক্রমণের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত না হয়, সে ব্যাপারে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে কড়া ভাষায় সতর্ক করেছেন ইরাকি প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ শিয়া আল-সুদানি। সংঘাত আরম্ভ হওয়ার পরপরই নানা প্রান্ত থেকে ছুটে আসা মিসাইল এবং যুদ্ধবিমানে ইরাকের আকাশ কার্যত ছেয়ে গিয়েছিল। ইরাকের সরকারপ্রধানের কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে যে, টেলিফোন আলাপে সুদানি স্পষ্ট করে বলেছেন যে তাদের আকাশ, স্থল বা জলসীমা ব্যবহার করে পার্শ্ববর্তী কোনো দেশের ওপর সামরিক পদক্ষেপ যেন কিছুতেই না নেওয়া হয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, তাদের দেশকে এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে টেনে আনার যেকোনো অপচেষ্টা তিনি রুখে দেবেন এবং যেকোনো বিদেশি শক্তির দ্বারা নিজেদের সীমানা লঙ্ঘনের কঠোর জবাব দেওয়া হবে।
অবশ্য যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রথম দিক থেকেই ভৌগোলিক কারণে ইরাক এর ক্ষতিকর প্রভাবের শিকার হয়েছে। ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অভিযোগ উঠেছে যে, তারা ওই অঞ্চলে সক্রিয় থাকা ইরানপন্থী সশস্ত্র দলগুলোর ওপর বোমাবর্ষণ করেছে। ওই হামলার প্রতিশোধ নিতে সেই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও ইরাক এবং পার্শ্ববর্তী এলাকায় অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে পাল্টা আঘাত হানার কথা স্বীকার করেছে।
গোটা বিশ্বের বাণিজ্যিক লেনদেনের ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালি নামের সমুদ্রপথটি অসামান্য গুরুত্ব বহন করে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হওয়া এই তুমুল যুদ্ধ আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনের এই প্রধান পথটিকে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। এই চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যেও দেশের ভেতরে জ্বালানির সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে বাংলাদেশ সরকার তাদের কূটনৈতিক তৎপরতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করেছে। ঢাকার পক্ষ থেকে করা বিশেষ অনুরোধের প্রেক্ষিতে তেহরান কথা দিয়েছে যে, হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে বাংলাদেশের জন্য জ্বালানি তেল এবং এলএনজি বহনকারী কোনো জাহাজের চলাচলে তারা বাধা সৃষ্টি করবে না।
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আমেরিকা ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে লড়তে থাকা এই দেশটি অনুরোধ করেছে যেন বাংলাদেশের কার্গোগুলো ওই প্রণালিতে প্রবেশের আগেই তাদের আগাম তথ্য প্রদান করে। ইরানের এমন ইতিবাচক সাড়ার ফলে দেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে তৈরি হওয়া তাত্ক্ষণিক দুশ্চিন্তা অনেকটাই দূর হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা।
গত সোমবার বাংলাদেশ সচিবালয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিষয়ক মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর সাথে বাংলাদেশে দায়িত্বরত ইরানের রাষ্ট্রদূত জলিল রহীমি জাহানাবাদীর একটি অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। মন্ত্রণালয়ের একাধিক বিশ্বস্ত সূত্র গণমাধ্যমকে এই বৈঠকের সত্যতা নিশ্চিত করেছে। এদিকে সংকটকালীন মুহূর্তে বাংলাদেশের জ্বালানি মজুত নিরাপদ রাখতে ভারত এবং চীনও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার সদিচ্ছা প্রকাশ করেছে।
দেশের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, জরুরি প্রয়োজনে বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রগুলোর সহায়তা নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিনিয়ত তাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে। বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনও নিশ্চিত করেছেন যে, সম্ভাব্য জ্বালানি সংকট এড়াতে ঢাকা ও বেইজিং কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করবে এবং যেকোনো দরকারি মুহূর্তে তার দেশ পাশে দাঁড়াতে পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে।
সূত্র: /সেবা হট নিউজ: সত্য প্রকাশ্যে আপোষহীন
বিশ্ব- নিয়ে আরও পড়ুন







খবর/তথ্যের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, সেবা হট নিউজ এর দায়ভার কখনই নেবে না।