মিলাদুন্নবী বনাম ঈদে মিলাদুন্নবী: কোনটি সুন্নাহ আর কোনটি বিদআত?
পৃথিবীর কোনো মুমিনই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্মের বিরোধিতা করতে পারে না। কারণ, মুমিন হওয়ার প্রধান শর্তই হলো রাসূলকে ভালোবাসা, তাঁর প্রতি ঈমান রাখা এবং তাঁর আগমনকে মানবজাতির জন্য রহমত হিসেবে মেনে নেওয়া। নবীজির জন্ম যে সমগ্র দুনিয়ার জন্য এক বিরাট নেয়ামত—এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তাঁর জন্মকে অস্বীকার করা বা অবহেলা করা একজন ঈমানদারের কাজ হতে পারে না।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—যদি নবীজির জন্ম স্মরণ করা ঈমানেরই দাবি হয়, তাহলে ঈদে মিলাদুন্নবী পালনে সমস্যা কোথায়? দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, উপমহাদেশে এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কেউ কেউ একে অপরকে কঠোর আখ্যা দিতেও কুণ্ঠিত হয় না। অথচ রাসূলকে ভালোবাসা যেখানে ঈমানের মানদণ্ড, সেখানে তাঁর জন্মকে কেন্দ্র করে বিভেদ তৈরি করা নিঃসন্দেহে দুঃখজনক ও অযৌক্তিক।
এখানেই মূল বিভ্রান্তি—রাসূল-এর জন্ম স্মরণ করা জায়েজ এবং নেকির কাজ, কিন্তু সেটিকে নির্দিষ্ট দিনে ঈদ বা উৎসবের রূপ দেওয়া শরিয়তের দৃষ্টিতে বিতর্কিত। এই লেখায় আমরা দুটি বিষয়ের সুস্পষ্ট পার্থক্য জানার চেষ্টা করব—কেন মিলাদুন্নবী জায়েজ, আর কেন ঈদে মিলাদুন্নবী বিদআত বলে বিবেচিত হয়।
মিলাদুন্নবী জায়েজ: দলিল ও ব্যাখ্যা
প্রথমেই আমাদের বোঝা দরকার "মিলাদুন্নবী" শব্দটির অর্থ কী। মিলাদুন্নবীর অর্থ হলো 'নবীর জন্ম' বা 'নবীর জন্মকালীন সময়ের আলোচনা ও ইতিবৃত্ত'। অর্থাৎ, নবীর জন্ম-স্মৃতিকে কেন্দ্র করে যেকোনো সময় আলোচনা, দান-সদকা, খানাপিনা ইত্যাদি করাকে সাধারণভাবে মিলাদুন্নবী বলা হয়।
এখন প্রশ্ন হলো, এসব কাজ কি খারাপ? অবশ্যই নয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই পৃথিবীতে এসেছেন বলেই আমরা ইসলাম পেয়েছি। সুতরাং তাঁর আগমন ও জন্মকাহিনী নিয়ে আলোচনা করা কখনোই খারাপ হতে পারে না। এমনকি কেউ যদি নবীর আগমনে খুশি হয়ে কাউকে খাওয়ায়, তাও গুনাহের কাজ নয়। কেননা আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন:
"বলুন, আল্লাহর ফযল ও রহমতই—সুতরাং এতেই তারা খুশি হোক। এটাই তারা যা জমা করছে তার চেয়ে উত্তম।" (সূরা ইউনুস: ৫৮)
সুতরাং নবী-এর আগমনের এই মহান নেয়ামত উপলক্ষে আমরা যদি যেকোনো সময় কোনো মাহফিল বা আলোচনা-সভার আয়োজন করি এবং একইসঙ্গে গরীব-দুঃখীসহ সবাইকে খাওয়াই, তাহলে তা নেকির কাজ। যারা মিলাদুন্নবীকে জায়েজ মনে করেন, তারা বিভিন্ন হাদিস থেকে প্রমাণ দেন—যেখানে রাসূল-এর জন্মকাহিনী, তাঁর বীরত্ব ও বংশের গৌরবগাঁথার বর্ণনা এসেছে। বিভিন্ন সাহাবী ও তাবেঈও রাসূল-এর আগমন, তাঁর সৌন্দর্য, মাহাত্ম্য ও গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেছেন। সুতরাং তাঁর জন্ম সম্পর্কে আলোচনা করা এবং এই পৃথিবীতে তাঁর আগমনের গুরুত্ব বর্ণনা করা ঈমান ও আমলের একটি অংশ—এতে যেকোনো সময় কোনো পাপ নেই।
মিলাদুন্নবী পালনের শরিয়তসম্মত পদ্ধতি
সহিহ হাদিসে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সোমবার সিয়াম (রোজা) পালন করতেন। সাহাবীরা এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন:
"এই দিনে আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এই দিনেই আমার ওপর ওহি অবতীর্ণ হয়েছে।" (সহিহ মুসলিম: ১১৬২)
লক্ষ করুন—নবী-এর জন্মের শুকরিয়া আদায়ের এই শরিয়তসম্মত রূপটি ছিল সিয়াম, আর তা ছিল প্রতি সপ্তাহে, বার্ষিক নয়। রাসূল-এর জীবদ্দশায় কোনো হাদিসেই এমন কোনো দৃষ্টান্ত নেই যে, তিনি প্রতি বছর এক নির্দিষ্ট তারিখে তাঁর জন্মবার্ষিকী পালন করেছেন।
এখান থেকেই শরিয়তসম্মত পালনের রূপটি স্পষ্ট হয়ে যায়। বছরের যেকোনো সময়—সপ্তাহের সোমবারে সিয়াম পালন করা, জন্ম-স্মৃতিকে কেন্দ্র করে আলোচনা করা, দান-সদকা করা, গরীব-দুঃখীকে খাওয়ানো—এসবই নেকির কাজ। শরিয়তের দৃষ্টিতে অনির্দিষ্ট সময়ে এই কাজগুলো করতে কোনো বাধা নেই, কারণ সূরা ইউনুসের আয়াত ও হাদিস থেকেই এর প্রমাণ পাওয়া যায়। মূল কথা হলো—মিলাদুন্নবীর নেকিরূপটি নির্ভর করে আলোচনা, শুকরিয়া, দান ও খাওয়ানোর ওপর; আর এটি যেকোনো সময় করা যায়।
ঈদে মিলাদুন্নবী বিদআত কেন
যদি মিলাদুন্নবী জায়েজই হয়, তাহলে ঈদে মিলাদুন্নবী পালন করা কেন বিদআত? এই প্রশ্ন খুবই স্বাভাবিক। আসুন জেনে নিই কী কী কারণে ঈদে মিলাদুন্নবী বিদআত বলে বিবেচিত হয়।
বিদআতের সংজ্ঞা ও ঈদে মিলাদুন্নবী
ইসলামের দৃষ্টিতে বিদআত হলো এমন কোনো কাজ বা আমল, যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বা তাঁর সাহাবীরা করেননি, কিন্তু পরবর্তীতে তা দ্বীনের অংশ মনে করে চালু করা হয়েছে। ঈদে মিলাদুন্নবী হলো—বার্ষিকভাবে, নির্দিষ্ট তারিখে, উৎসবের আকারে রাসূল-এর জন্মোৎসব পালন করা। এই উৎসব কুরআন, হাদিস বা সাহাবীদের আমল থেকে প্রতিষ্ঠিত নয়। রাসূল, সাহাবী—এমনকি ইসলামের চার খলিফাও—এই ধরনের কোনো আমল করে যাননি বা করার নির্দেশ দেননি। তাই বার্ষিক উৎসব আকারে এটি পালন করা বিদআতের পর্যায়ে পড়ে।
রাসূল ও সাহাবীদের আমল নয়
চিন্তা করুন—রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি বার্ষিক জন্মোৎসব পালনে কোনো নেকী থাকত, তবে তিনি কি সেটি করতেন না? তিনি তো আল্লাহর শুকরিয়া আদায়ের জন্য সোমবার সিয়াম পালন করতেন। আর সাহাবীরাই জিজ্ঞেস করেছিলেন, আপনি কেন সোমবার সিয়াম পালন করেন? যখন রাসূল জানালেন যে তিনি সিয়ামের মাধ্যমে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছেন, তখন সওয়াবের আশায় সাহাবীরা কেন প্রতি সোমবার সিয়াম পালন করলেন না? অথচ জন্মদিনের কথা যখন আসলো, তখন জন্মবার্ষিকীর কথা কেন আসলো না? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর স্পষ্ট—কারণ বার্ষিক জন্মবার্ষিকী পালন তখন কোনো আমলই ছিল না।
নির্দিষ্ট তারিখে বার্ষিক পালন
মিলাদুন্নবীর আলোচনা, খানাপিনা সারা বছর অনির্দিষ্টভাবে করা হলে শরিয়তের দৃষ্টিতে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু যখনই এই কার্যক্রম একটি নির্দিষ্ট তারিখে বার্ষিক উৎসবের রূপ পায়, তখনই সমস্যা তৈরি হয়। যেসব হাদিসে সাহাবীদের জন্ম-সম্পর্কিত আলোচনার প্রমাণ পাই, সেখানে বার্ষিক পালনের কোনো উল্লেখ নেই। বরং সেখান থেকে প্রমাণিত, সাহাবীরা বিভিন্ন সময়ে রাসূল-এর জন্ম সম্পর্কে আলোচনা করতেন এবং এই নেয়ামতের জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতেন। কিন্তু নির্দিষ্ট তারিখে ঘটা করে বার্ষিক পালনের কোনো প্রমাণ শরিয়তে নেই।
জন্মতারিখের অনিশ্চয়তা
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য—আমরা সুনির্দিষ্ট করে ১২ই রবিউল আউয়ালকে নবী-এর জন্মদিন ধরে পালন করি, অথচ ঐতিহাসিকদের মতে এই তারিখটি সুনির্দিষ্ট নয়। বিভিন্ন ঐতিহাসিকদের মতে তাঁর জন্মতারিখ ৮, ৯, ১১ অথবা ১২ই রবিউল আউয়াল। আর অধিকাংশ গবেষকের জোরালো মতামত হলো—তাঁর জন্ম ৮ই অথবা ৯ই রবিউল আউয়াল। উল্লেখ্য, হিজরি সন প্রবর্তিত হয়েছে রাসূল-এর মৃত্যুর অনেক বছর পরে—দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর (রাদিআল্লাহু আনহু)-এর আমলে, ১৭ হিজরিতে। এমন অবস্থায় "৫৭০ খ্রিস্টাব্দের ১২ই রবিউল আউয়াল" বলে নির্দিষ্ট একটি তারিখে বার্ষিক উৎসব পালন করা ঐতিহাসিকভাবেও অসংগত। বরং তাঁর মৃত্যুর তারিখ ১২ই রবিউল আউয়াল—এটাই অধিকতর সুনিশ্চিত।
বিধর্মীদের অনুসরণ
বার্ষিক জন্মোৎসব পালন করা পরোক্ষভাবে বিধর্মীদের অনুসরণেরও শামিল। পৃথিবীর অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা তাদের ধর্মীয় প্রধানদের জন্মদিন পালন করে। অনেক মুসলমানও সেই পদ্ধতিতেই রাসূল-এর জন্মদিনকে কেন্দ্র করে ঈদে মিলাদুন্নবী পালন করেন। অথচ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জীবদ্দশায় বিধর্মীদের কাজের সাথে কোনো মিল না রাখার বিষয়ে অত্যন্ত কঠোরতা অবলম্বন করেছেন। রাসূল-এর ভালোবাসা লাভের উপায় হলো তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ—তাঁর অনুসরণ না করে কীভাবে তাঁর ভালোবাসা লাভ সম্ভব?
রাসূলকে নিয়ে বাড়াবাড়ি
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই তাঁকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেছেন। হাদিসে এসেছে:
"তোমরা আমাকে বাড়াবাড়ি করে বড়াও করো না, যেমন খ্রিস্টানরা মারইযাম-তনয় ঈসার ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করেছে। বরং আমাকে আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল বলবে।" (সহিহ বুখারী: ৩৪৩৯)
আজ ঈদে মিলাদুন্নবী পালনের সময় অনেক ক্ষেত্রে ঠিক এই বাড়াবাড়িই হয়। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা নিষেধ করেছেন, তা পালন করে তাঁর ভালোবাসা লাভ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
দুইয়ের পার্থক্য একনজরে
উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে দুইয়ের পার্থক্য অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মিলাদুন্নবী হলো—নবী-এর জন্ম-স্মৃতিকে কেন্দ্র করে যেকোনো সময় আলোচনা, শুকরিয়া, দান ও খানাপিনা করা; আর ঈদে মিলাদুন্নবী হলো—প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট তারিখে, নির্দিষ্ট তারিখ ও ঈদ-উৎসবের আকারে পালন করা।
প্রথমটির সপক্ষে কুরআনের আয়াত ও সাহাবীদের আমল রয়েছে—তা নেকির কাজ। আর দ্বিতীয়টির পক্ষে কুরআন, হাদিস বা সাহাবীদের কোনো আমল নেই—বরং তা পরবর্তীকালে চালু হওয়া একটি নতুন আমল, যা বিদআতের পরিভাষায় পড়ে। সহজ কথায়—নবী-এর জন্ম স্মরণ করা জায়েজ, আর তাকে নির্দিষ্ট দিনে বার্ষিক উৎসব বানানো জায়েজ নয়।
বিদআত নয়, সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরি
উপর্যুক্ত তথ্য ও বিশ্লেষণের ভিত্তিতে আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি—রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্ম একটি মহান নেয়ামত। এই নেয়ামত উপলক্ষে তাঁর জীবনাদর্শ নিয়ে কথা বলা, আলোচনা করা এবং গরীব-দুঃখীকে খাওয়ানো নিঃসন্দেহে নেকির কাজ। এই অর্থে মিলাদুন্নবী জায়েজ। কিন্তু যখন এই কাজটি প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট তারিখে, উৎসবের আকারে পালন করা হয়, তখন তা শরিয়তের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়—কারণ এর কোনো প্রমাণ কুরআন, হাদিস বা সাহাবীদের আমল থেকে পাওয়া যায় না।
যারা রাসূল-এর প্রকৃত ভালোবাসা পেতে চান, তাদের উচিত তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ করা এবং তাঁর নির্দেশিত পথে চলা। শুধুমাত্র আবেগের বশে এমন কোনো আমল করা উচিত নয়, যা ইসলামে পরবর্তীতে সংযোজিত হয়েছে। আমাদের কর্তব্য হলো সঠিক জ্ঞান অর্জন করা, কুরআন ও হাদিসের আলোকে জীবন পরিচালনা করা এবং যেকোনো ধরনের বিদআত থেকে নিজেদের রক্ষা করা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সঠিক জানা ও বোঝার তাওফিক দান করুন। আমীন।
লেখক ও সমাজগবেষক
-Birthday-Love-or-Bid'ah.webp)

%20%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%B6%E0%A7%8D%E0%A6%AC%20%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A6%AC%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%B0%20%E0%A6%AE%E0%A7%81%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%BF%E0%A6%B0%20%E0%A6%B8%E0%A7%87%E0%A6%BE%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%A8.webp)


খবর/তথ্যের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, সেবা হট নিউজ এর দায়ভার কখনই নেবে না।