প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপন হত্যা ও শুদ্ধস্বর প্রকাশনীর তিন জনের ওপর হামলার ঘটনার কোনো কূলকিনারা হয়নি। এই দুই ঘটনায় পুলিশ ও র্যাব মূল আসামি দূরে থাক, সন্দেহভাজন কাউকেও আটক করতে পারেনি। এমন পরিস্থিতিতে শুদ্ধস্বর প্রকাশনীতে হামলায় আহত প্রকাশক আহমেদুর রশীদ চৌধুরী টুটুল ও ব্লগার তারেক রহিম কয়েকদিন আগে দেশ ছেড়ে চলে গেছেন যুক্তরাষ্ট্র। তাদের সহকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে বলেন, জীবনের নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখেই তারা দেশ ছেড়ে চলে গেলেন। আহত রণদীপম বসুও দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার চিন্তা-ভাবনা করছেন।
গত ৩১ অক্টোবর শাহবাগে আজিজ সুপার মার্কেটের তৃতীয় তলায় জাগৃতি প্রকাশনার মালিক দীপনকে দুর্বৃত্তরা কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করে। প্রায় একই সময় লালমাটিয়ায় শুদ্ধস্বর প্রকাশনীতে হামলা চালিয়ে প্রকাশক আহমেদুর রশীদ চৌধুরী টুটুল, ব্লগার তারেক রহিম ও লেখক রণদীপম বসুকে গুরুতর আহত করা হয়। এই দুই ঘটনায় দায়ের করা মামলা তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন শাখার উপ-কমিশনার মুনতাসিরুল ইসলাম বলেন, এই দুই ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে আটক বা গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, মোবাইল ফোনের কললিস্ট ও একটি ভিডিও ফুটেজ যাচাই-বাছাই করে ধারণা করা হচ্ছে, ঘাতকরা হত্যাকাণ্ডের আগে-পরে কোনো প্রযুক্তিগত মাধ্যমের সহায়তা নেয়নি। এ কারণে এই দুই ঘটনা তদন্তে ‘গুপ্তচর’ নিয়োগ করা হয়েছে।
অন্যদিকে র্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আবুল কালাম আজাদ বলেন, ঘাতকরা হত্যা ও হামলার আগে-পরে মোবাইল ফোন ব্যবহার করেননি। এমনকি আজিজ সুপার মার্কেটের ভিডিও ফুটেজ দেখে হত্যায় সন্দেহভাজন হিসাবে যাদের রাখা হয়েছিল, তাদের ব্যাপারে কোনো তথ্যই মেলেনি।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, শাহবাগ ও লালমাটিয়া কেন্দ্রিক সকল মোবাইল অপারেটরের টাওয়ার থেকে ঘটনার সময়ের মোবাইল ফোনের কললিস্ট সংগ্রহ করা হয়। প্রায় এক লাখ মোবাইল ফোনের নম্বর যাচাই-বাছাই করেও ঘাতককে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। তিনি আরো বলেন, ধারণা করা হচ্ছে, ঘাতকরা এই হত্যা ও হামলার সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার করেনি।
শাহবাগ আজিজ সুপার মার্কেটের ৭টি সিসি ক্যামেরা থেকে প্রায় চার ঘণ্টার ভিডিও ফুটেজ নিয়ে পুলিশ ও র্যাব যাচাই-বাছাই করে। ভিডিও ফুটেজ দেখে তিন জনের ব্যাপারে সন্দেহ জাগে গোয়েন্দাদের। এ ব্যাপারে এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, তাদের পরনে ছিল শার্ট ও প্যান্ট। এদের মধ্যে একজনের পরনে ছিল জিন্স প্যান্ট। মার্কেটে প্রবেশের সময় এদের চোখের ভাষা (আই কন্টাক্ট) ছিল এক রকম। মার্কেট থেকে বের হয়ে যাওয়ার সময় চোখের ভাষা ছিল আরেক রকম। মার্কেটে প্রবেশের চেয়ে বের হওয়ার সময় তাদের গতি ছিল একটু বেশি।
ভিডিও ফুটেজে আজিজ সুপার মার্কেটের নিচ তলায় দুই দিকের প্রবেশ গেটের আশপাশে কয়েকজনের চলাচল দেখে গোয়েন্দারা সন্দেহ করছেন, তারা ঘাতকদের সহযোগী হতে পারে এবং হত্যাকাণ্ডের আগে রেকি করে নিচ্ছে। ভিডিও ফুটেজ থেকে সন্দেহভাজনদের পৃথকভাবে প্রায় তিন হাজার ছবি তৈরি করে শনাক্তের জন্য মাঠে কাজ করা হচ্ছে। কিন্তু পুলিশ বা র্যাব তাদের শনাক্ত করতে পারেনি।
গতকাল শুদ্ধস্বরের প্রকাশক আহমেদুর রশীদ টুটুলের একজন সহকর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা গেছে, আহতরা চিকিত্সা নিয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে বাসায় ফেরার পর তীব্র আতঙ্কে ভুগতে থাকেন। তারা কোথায় থাকছেন, কীভাবে থাকছেন—এ ব্যাপারে কোনো তথ্য ঘনিষ্ঠজন ছাড়া বাইরের কাউকে জানানো হয়নি। একপ্রকার গোপনীয়তার মধ্যে কয়েকদিন আগে টুটুল ও তারেক রহিম যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। রণদীপম বসুও বিদেশ যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন। তাদের বিদেশ যাওয়ার ব্যাপারে ওই সহকর্মী আরো বলেন, অবস্থান জানতে পারলে, হামলাকারীরা আবারও তাদের ওপর হামলা চালাতে পারে। এই আশঙ্কায় তারা বিদেশ চলে গেছেন।
এদিকে ফয়সল আরেফিন দীপন হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ ও খুনিদের বিচারের দাবিতে গতকাল বিকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজুমঞ্চে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সমাবেশে ‘প্রত্যয় প্রতিমা’ কবিতাটি পাঠ করা হয়। প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজক কবি লুবনা হাশেম জানান, তরুণ লেখক, ব্লগার হত্যার বিচার না হওয়া পর্যন্ত সমাবেশ চলবে।


খবর/তথ্যের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, সেবা হট নিউজ এর দায়ভার কখনই নেবে না।