
একটি ইতিবাচক চুক্তির আশায় প্যারিস জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলনের মেয়াদ আরো একদিন বাড়ানো হলো। গতকাল শুক্রবার ছিল ১১ দিনব্যাপী সম্মেলনের শেষ দিন। কিন্তু জলবায়ু অর্থায়নসহ নানা ইস্যুতে মতবিরোধ থাকায় এদিন প্রতিনিধিরা চুক্তি চূড়ান্ত করতে পারেননি।
সম্মেলনের সভাপতি এবং ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট ফ্যাবিউস সময় বাড়ানোর কথা জানিয়ে বলেন, ‘আমরা একটি চুক্তি করার একেবারে কাছাকাছি পৌঁছেছি। আশা করা যাচ্ছে শনিবারের (আজ) মধ্যে চুক্তিতে উপনীত হওয়া যাবে।’ সম্মেলনে অংশ নেয়া বাংলাদেশের এক প্রতিনিধি জানিয়েছেন, আজ সকালের মধ্যে মূল চুক্তির কপি প্রতিনিধিদের দেয়া হবে। ফ্রান্সের সময় দুপুর নাগাদ তা চূড়ান্ত হবে।
দূষণ কমাতে সম্মেলনে একটি আইনগত বাধ্যবাধকতা চুক্তি হওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা হচ্ছে না বলে জানা গেছে। চুক্তিতে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি দুই না দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াসে রাখা হবে তা নিয়ে এখনো মতবিরোধ আছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারনে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর প্রতিনিধিরা চাইছেন গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি দেড় শতাংশের নিচে রাখতে। আর চীন এবং ভারতের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো চাইছে চুক্তিতে গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার যেন দুই ডিগ্রি সেলসিয়াসে রাখা হয়। এর ফলে ওই দেশগুলো তাদের দেশের উন্নয়নে জীবাশ্ম জ্বালানি বা ফসিল ফুয়েল ব্যবহার করতে পারবে।
দূষণের মাত্রা নিয়েও উন্নয়নশীল এবং উন্নত বিশ্বের প্রতিনিধিদের মধ্যে মতবিরোধ চলছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর মতে, যেহেতু শিল্পোন্নত দেশগুলো দূষণ বেশি করছে সেহেতু দায়দায়িত্বের বেশির ভাগই তাদের কাঁধে নিতে হবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য ধনী দেশের মতে, উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোও দূষণ কম করছে না। এ জন্য তাদের ঘাড়েও দায়িত্ব নিতে হবে।
অপরদিকে জলবায়ু পরিবর্তনে মাত্রাতিরিক্ত ঝুঁকিতে থাকা ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধিরা আলোচনার ধরন দেখে অনেকটা হাতাশা ব্যক্ত করেছেন। মার্শাল আইল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী টনি ডি ব্রুম সম্মেলনের বাইরে এসে চিত্কার দিয়ে বলেছেন, ‘কিছু একটা করুন। যাতে দেশে গিয়ে জনগণকে বলতে পারি তোমাদের বেঁচে থাকার আশা এখনো শেষ হয়ে যায়নি।’ লন্ডনভিত্তিক এনার্জি অ্যান্ড ক্লাইমেট ইন্টিলিজেন্স ইউনিটের পরিচালক রিচার্ড ব্ল্যাক বলেছেন, এই প্রথম জলবায়ু চুক্তিতে প্রতিটি দেশ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের জন্য আলাদাভাবে ওয়াদা করেছে। অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলি বিশপ বলেছেন, যে চুক্তিটি আসছে তা নিয়ে উচ্ছ্বসিত হওয়ার কারণ রয়েছে।
প্যারিস চুক্তি নিয়ে যে মতবিরোধটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে তা হলো জলবায়ু অর্থায়ন। ছয় বছর আগে কোপেনহেগেন সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর জন্য ২০২০ সাল থেকে প্রতিবছর একশ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সহায়তা দেয়ার ঘোষণা দিয়েছিল উন্নত দেশগুলো। কিন্তু এ তহবিলে কীভাবে অর্থ আসবে তা এখনো পরিষ্কার নয়। অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টায় উন্নত দেশগুলো শেষ পর্যন্ত ২০২০ সালে একশ বিলিয়ন ডলার দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও এর পরের বছর থেকে কী হবে তা এখনো পরিষ্কার করে কেউ বলছে না। আবার এই অর্থ কীভাবে ব্যয় করা হবে বা ক্ষতির মাত্রা কীভাবে ধরা হবে তা নিয়েও মতবিরোধ আছে।
এদিকে সম্মেলনে উন্নয়নশীল দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় ‘লস অ্যান্ড ডেমেজ’ পদ্ধতি ব্যবহারের দাবি তুলেছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এই পদ্ধতির তীব্র বিরোধিতা করছে। তাদের মতে, এ পদ্ধতি চালু হলে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো ক্ষতিপূরণ দিতে দিতে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হারাবে। জাতিসংঘের জলবায়ু প্রধান ক্রিস্টিয়ানো ফিগিউরেস কথা বলেছেন অভিযোজন তহবিল নিয়ে। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোকে সহায়তা করতে এ তহবিলে অর্থ সহায়তা বাড়াতে হবে।
অপরদিকে সম্মেলন শেষ দিকে এসে চুক্তি নিয়ে দেশগুলোর আপত্তির সংখ্যা কমে আসছে। খসড়া চুক্তি প্রকাশিত হওয়ার সময় এ আপত্তি বা ব্রাকেটের সংখ্যা ছিল নয়শ। এখন তা কমে ৫০-এ দাঁড়িয়েছে।

খবর/তথ্যের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, সেবা হট নিউজ এর দায়ভার কখনই নেবে না।