হাজার বছরের ঐতিহ্য, ইতিহাস এবং শিল্পশৈলির নিদর্শন নিয়ে গড়ে ওঠা দেশের অন্যতম প্রাচীন বন্দরনগরী চট্টগ্রাম এবং এর আশপাশের অসংখ্য পুরাকীর্তি, স্থাপত্যনিদর্শন সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে। যেগুলো আজো টিকে আছে সেগুলোও সংরক্ষণ ও সংস্কারের অভাবে বিপন্নপ্রায়। এসব রক্ষায় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, গণপূর্ত বিভাগসহ সরকারি বেসরকারি কোনো মহলেরই উদ্যোগ-প্রচেষ্টা আজ পর্যন্ত দেখা যায় নি।
গবেষক এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘরের সাবেক কিউরেটর ড. শামসুল হোসাইন ‘ইত্তেফাক’কে বলেন, অবস্থা খুবই খারাপ, এসব সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিয়ে কেউ আজ অবধি এগিয়ে আসেনি। পুরাতত্ত্ব বিভাগ বলে যে সংস্থাটি রয়েছে সেটি আজ পর্যন্ত চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক স্থাপত্যকীর্তিগুলোর ব্যাপারে দায় প্রকাশ করেনি। তিনি অভিযোগের আঙ্গুল তোলেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসন এবং চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের দিকে। তিনি বলেন, এসব সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও আধা সরকারি সংস্থা চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক পুরাকীর্তি, ঐতিহাসিক স্থাপত্যকীর্তি সংরক্ষণে বিন্দুমাত্র মমত্বের পরিচয় দিচ্ছে না। তাই প্রশ্ন উঠছে স্থাপত্যকীর্তিগুলো সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করবে কে। এসব রক্ষা করা সভ্য জাতির পরিচায়ক, এজন্য দেশে একটি ‘স্থাপত্যকীর্তি ট্রাস্ট’ প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই। তিনি জানান চট্টগ্রাম আদালত ভবনকে পুরাকীর্তি ঘোষণার দাবি উঠেছিল। জনদাবি আমলে নেয়া হয়নি। ভবনটির সংরক্ষণ কাজ হয়েছে মাত্র। বটতলী রেলস্টেশনের সংরক্ষণকাজ সম্পন্ন হয়েছে।
অপরিকল্পিত নগরায়ন ও অবহেলায় চট্টগ্রামের বহু ঐতিহাসিক স্থাপনা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। নগরীর রঙমহল পাহাড়ে সম্প্রতি আবিষ্কৃত ধ্বংসাবশেষ, যা একটি প্রাচীন দুর্গের নিদর্শন ছিল, তা রক্ষা করা যায়নি। ১৭৮৬ সালে জাফরাবাদে স্যার উইলিয়াম জোনস-এর বাড়িটি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। চট্টগ্রাম কলেজ এলাকায় চারদিকে গোলাকার থামসজ্জিত বারান্দাওয়ালা একটি একতলা ভবন ১৯৬৪ সালে ভেঙে ফেলা হয়। মুসলিম হাইস্কুলের পুরনো দালান, নগরীর প্রধান ডাকঘর ভবন, স্টেশন রোডের রেস্ট হাউস, সদরঘাট রোডে পি.কে সেনের দালান ভেঙে ফেলা হয়েছে। দক্ষিণ হালিশহরে রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের জন্য ভূমি হুকুমদখলকালে ধ্বংস করা হয় পতেঙ্গায় স্থানীয় জমিদারদের বার্মার সেগুন কাঠে তৈরি অনেকগুলো নান্দনিক টং বাড়িঘর ও ইবাদতখানা।
ড. শামসুল হোসাইন জানান, ঔপনিবেশিক শাসনামলে চট্টগ্রামে নির্মিত অনেক দালানকোঠা, স্থাপত্য নিদর্শন বর্তমানে পুরাকীর্তি-মর্যাদার দাবিদার হয়ে উঠেছে। এগুলো হচ্ছে: মাদ্রাসা পাহাড়ে দারুল আদালত, পরীর পাহাড়ে আদালত ভবন, সেন্ট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিং (সিআরবি ভবন), কাঠের বাংলো ১ ও ২, কদমতলী রেলস্টেশন, পাহাড়তলী রেলওয়ে ওয়ার্কশপ, পুরাতন সার্কিট হাউস, রঙমহল পাহাড়ে জেনারেল হাসপাতাল, চট্টগ্রাম কলেজের প্রাচীন দালানকোঠা, কলেজিয়েট স্কুল, খাস্তগীর স্কুল, পুলিশ আর্মারি, পুলিশ হাসপাতাল, সদরঘাটে পুরনো পোর্ট অফিস, মির্জার পুল, কালুরঘাট রেলওয়ে ব্রিজ, দামপাড়া ওয়াটার ওয়ার্কস, জে.এম সেন হল, লায়ন সিনেমা হল ভেঙে ফেলা হয়েছে, চট্টগ্রাম ক্লাবের পুরনো ভবন, ভাঙঘুটনার শিখ মন্দির, চট্টেশ্বরী কালিবাড়ী, সদরঘাট কালিবাড়ী, চার্চ অব আওয়ার লেডি রোসারি, ক্রাইস্ট চার্চ, সেন্ট জেভিয়ার্স চার্চ, ফিরিঙ্গী বাজারে পি.কে সেনের সাততলা ভবন, চন্দনপুরার নাচঘর, দক্ষিণ-মধ্যম হালিশহরে মালুমের দোতলা কাঠের বাংলো, মিয়া খান নগরে মিয়া খান বাড়ি, আন্দরকিল্লায় হাতি কোম্পানির বাড়ি, ফিরিঙ্গী বাজারে দোভাষ বাড়ি ইত্যাদি।
প্রায় ১১৯ বছর আগে চট্টগ্রাম শহরের ৪টি এবং শহরের বাইরের ৮টি স্থাপত্যকে পুরাকীর্তি হিসাবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল। শহরের স্থাপত্যগুলোর মধ্যে ছিল চকবাজারের অলিখাঁ মসজিদ, আন্দরকিল্লা শাহি জামে মসজিদ, রহমতগঞ্জের কদম মোবারক মসজিদ এবং হামজারবাগের হামজা মসজিদ। এসব মসজিদের সম্প্রসারণ ও রক্ষণাবেক্ষণে প্রাচীন শিল্পশৈল্পির নান্দনিক আদল ক্ষুণ্ন হয়েছে। বাঁশখালি মসজিদ ছাড়া পুরো চট্টগ্রাম জেলায় বর্তমানে দেশের সরকারি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের ভূমিকা নেই।
একসময় চট্টগ্রামে গণপূর্ত বিভাগে দায়িত্ব পালনকারী বর্তমানে সিলেটে কর্মরত প্রকৌশলী নজরুল ইসলাম ‘ইত্তেফাক’কে বলেন, চট্টগ্রামে তার কর্মকালে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের কোনো শাখা ছিল না। এছাড়া গণপূর্ত বিভাগের উপর পুরাতন স্থাপত্যকীর্তি, ঐতিহাসিক স্থাপনা রক্ষার কোনো দায়িত্ব নেই।

