রাখাল ও জমিদার কন্যা

Seba Hot News : সেবা হট নিউজ
0
মোঃ সৈয়দুল ইসলাম: অচিনপুরের এতিম যুবক মোহন ও জমিদার কন্যা মালার প্রেমকাহিনি নিয়ে গল্প ‘রাখাল ও জমিদার কন্যা’। লিখছেন সুনামগঞ্জের উদীয়মান লেখক মোঃ সৈয়দুল ইসলাম।
রাখাল ও জমিদার কন্যা: সুর, সততা আর নিখাদ ভালোবাসার গল্প
রাখাল ও জমিদার কন্যা: সুর, সততা আর নিখাদ ভালোবাসার গল্প। ছবি: Gemini



রাখাল ও জমিদার কন্যা: সুর, সততা আর নিখাদ ভালোবাসার গল্প

গ্রামের নাম অচিনপুর। গ্রামের আলো বাতাসে বেড়ে ওঠা এক সহজ সরল রাখালের নাম মোহন। মোহন দেখতে খুবই সুন্দর। চেহারা যেন ছবির মতো। দুঃখের বিষয়, তিন বছর বয়সেই মোহন তার বাবা-মাকে হারায়। এরপর বৃদ্ধ দাদা দাদির কাছে সে বড়ো হতে থাকে। হঠাৎ করে একদিন তার দাদা অসুস্থ হয়ে পড়ে। ভীষণ অসুস্থ। মাথা তুলতে পারেনা এমন অবস্থা। তার দাদি বললো- "ভাই মোহন, ঘরে খাবার দাবার কিছুই নেই"। তোমার দাদার চিকিৎসা করানোর মতো টাকাও নেই। এখন কি করব ভাই? দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে মোহন বললো- "মা-বাবাকে হারিয়ে তোমাদের কাছে বড় হয়েছি"। তোমরা ছাড়া আপন বলতে পৃথিবীতে আমার কেউ নেই। মোহন তার অসুস্থ দাদাকে জড়িয়ে ধরে বললো- "চিন্তা করোনা দাদা। আমি কাজ করে তোমার জন্য ঔষধ নিয়ে আসবো, তুমি তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যাবে"। এ কথা শোনার পর তার দাদা বললো- "আমার কিছু হয়নি, আমি ভালো হয়ে যাবো"। তুমি ছোট মানুষ। তোমার কাজ করার বয়স এখনো হয়'নি ভাই।

পাশের বাড়ির শান্তু মিয়া এ কথা শোনার পর দৌড়ে এসে বললো- "কাজ করবে'না তো কি করবে। তোমার তো কোন সন্তান নেই, যে তোমাদের খেয়াল রাখবে"। চিকিৎসা করাবে। সাথে সাথে মোহন বলে উঠলো, সন্তান নেই তো কি হয়েছে। আমি তো আছি। দাদা দাদির খেয়াল আমি রাখবো। কিন্তু, মোহন কী কাজ করবে? সে"তো কোনদিন কাজই করেনি। আর কেইবা তাকে কাজ দেবে। শান্তু মিয়া তার দাদা দাদিকে বলল- মোহন যেহেতু ছোট মানুষ, তাকে মাসিক বেতনে পশ্চিম পাড়া কদম আলীর বাড়িতে দিলে কেমন হয়। মাসে কদম আলী ছয় থেকে সাত হাজার টাকা বেতন দিবে। তার দাদা-দাদি শান্তু মিয়াকে জিজ্ঞেস করলো, তার কাজ কী? শান্তু মিয়া বললো- "কদম আলীর পনেরো থেকে বিশটা গরু আছে। গরুগুলোকে ঘাস খাওয়ানোর জন্য সকালে মাঠে নিয়ে যাবে এবং বিকালে বাড়িতে নিয়ে আসবে"।

এই কথাগুলো শোনে মোহনের দাদা-দাদি খুব কষ্ট পেলো। আর বললো- আমাদের মোহন গরু রাখবে। মানুষ তাকে গরু রাখাল ডাকবে। এই ভেবে দাদা-দাদি দুজনেই কেঁদে ফেললো। শেষমেষ, পরিবারের চিন্তা করে তারা রাজি হয়ে গেলো। পরেরদিন থেকে মোহন কদম আলীর বাড়িতে মাসিক বেতনে চাকরি নিলো। শুরু হলো তার নতুন জীবন। মোহন প্রতিদিন সকালে গরু নিয়ে মাঠে যায় আর বিকালে গরু নিয়ে ফিরে আসে। কিছুদিন যাওয়ার পর মোহন লোকমুখে শুনেছে রাখালেরা মাঠে গরু চরায় আর বাঁশি বাজায়। মোহন মনে মনে বলতে লাগলো আমি'তো বাঁশি বাজাতে পারিনা। অনেক চিন্তা ভাবনার পর বাঁশি কেনার জন্য তার মত ঠিক করলো এবং বাজার থেকে একটি বাঁশি কিনে নিয়ে আসলো। মাঠে গরু চরানোর ফাঁকে ফাঁকে মোহন প্রতিদিন বাঁশি বাজায়। মোহন যেখানে গরু চরায় তার পাশেই রয়েছে একটি হিজল বন। আর এই হিজল বনের ছায়ায় বসেই সে আরামে বাঁশি বাজায়। এভাবে আস্তে আস্তে মোহন বাঁশি বাজানো শিখে ফেললো। হিজল বন এলাকার একটি পরিচিত বন। এই বনে প্রতিদিন বিকালে শত শত ছেলেমেয়ে ঘুরতে আসে। আর মনের আনন্দে সবাই ছবি তুলে হিজল বনে একাকার হয়ে যায়। এদিকে মোহনের মায়াবী বাঁশির সুর শোনার জন্য সবাই তাকে ঘিরে ধরে এবং মুগ্ধ হয়ে বাঁশির সুর শুনে। তার বাঁশির সুর শুনে পাখিরাও ডালে ডালে কিচিরমিচির শব্দ শুরু করে এবং বৃক্ষলতাও নিরব হয়ে যায়। একদিন, এলাকার জমিদারের কন্যা মালা হিজল বনে ঘুরতে আসে। এসে হিজল বন দেখে খুবই খুশি হয়। হঠাৎ করে মোহনের বাঁশির সুর মালার কানে আসে। মালা তার বান্ধবীদের বললো- "এই বনে বাঁশি কে বাজায়"? এমন মায়াবী বাঁশির সুর আগে কখনো শুনিনি। বান্ধবীরা বললো-" বাঁশি রাখাল বাজায়"। এই বনের পাশের মাঠে সে গরু চরায় আর হিজল বনে বসে বাঁশি বাজায়। মালা তার বান্ধবীদের নিয়ে রাখালের কাছে গেল এবং তার সাথে পরিচিত হলো। জমিদার কন্যা মোহনকে বললো- "তোমার বাঁশির সুর আমাকে মুগ্ধ করেছে"। আমি প্রতিদিন তোমার মায়াবী বাঁশির সুর শোনার জন্য এই বনে আসবো। এই বলে মালা বন থেকে চলে গেলো। মোহন চিন্তায় পড়ে গেলো আর মনে মনে বলতে লাগলো আল্লাহ জানে কপালে কি আছে। মালা মোহনের বাঁশির সুর শোনার জন্য প্রতিদিন হিজল বনে আসে এবং মুগ্ধ হয়ে তার বাঁশির সুর শুনে। এভাবে কিছুদিন বাঁশির সুর শুনতে শুনতে জমিদার কন্যা রাখাল মোহনের প্রেমে পড়ে গেলো। একদিন মালা মোহনকে তার ভালোলাগার কথা বলেই ফেললো। মোহন বলল- "আমি সামান্য রাখাল আর তুমি জমিদার কন্যা"। এ হতে পারেনা। তুমি এখান থেকে চলে যাও। জমিদার কন্যা নাছোর বান্দা। সে কোন কথা শুনতেই চায় না। মোহন বাড়িতে গিয়ে তার দাদা-দাদির কাছে বিষয়টি খুলে বললো। বিষয়টি শোনার পর তাদের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লো। তার দাদা-দাদি তাকে বাঁশি বাজানো ছেড়ে দিতো বলল। কিন্তু, মোহন বললো- "আমি এটা ছাড়তে পারবো না। কেননা, বাঁশির সুর দিয়েই আমি গরুগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করি। আর এই বাঁশিই আমার একমাত্র সঙ্গী"। এই বলে মোহন চলে গেলো। এদিকে পুরো এলাকায় জমিদার কন্যার রাখালকে ভালোবাসার ঘটনাটি ছড়িয়ে পড়লো। রাতে খাবার খাওয়ার সময় কদম আলী মোহনকে বললো- "কি শুনছি, জমিদার কন্যা মালা নাকি তোমাকে ভালোবাসে"। মোহন বললো- "আপনি ঠিকই শুনেছেন চাচা"। কদম আলী বললো- "বাবা, ও জমিদার কন্যা। তোমার জীবন নিয়ে খেলা করবে। তুমি ওর কথায় কান দিও না"। পরের দিন মোহন সকাল সকাল গরু নিয়ে মাঠে চলে গেলো। তার কিছুই ভালো লাগছিল না। গ্রামের অন্যান্য রাখালেরা মোহনকে বললো- কী হয়েছে ভাই? মনমরা হয়ে বসে আছো কেনো। আজ বাঁশি বাজাবে না? মোহন বললো- "এই বাঁশি আমার জন্য কাল হয়ে দাড়িয়েছে"। এই কথা শেষ করতে না করতেই জমিদার কন্যা হাজির হয়ে গেলো। মালা মোহনকে বললো- "আমি সারারাত ঘুমাতে পারিনি। সারাক্ষণ শুধু তেমার কথা মনে পড়ে"। মোহন বললো- "মালা, আমি তেমাকে ভালোবাসতে পারবো না আমাকে ক্ষমা করো"। জমিদার কন্যা অশ্রুসিক্ত নয়নে বললো- "মোহন, তুমি যদি রাজি না হও আমি আত্মহত্যা করবো"। মোহন বললো- দেখো মালা, আমি গরিব। আমার বাড়ি নেই, ঘর নেই। সামান্য বেতনে চাকরি করি। আমার দাদা-দাদির মুখে ঠিকমতো খাবার দিতে পারিনা। মালা বললো- আমি এই সব শুনতে চাই না। প্রয়োজনে গাছতলায় থাকবো, খেয়ে না খেয়ে থাকবো। এই বলে মালা চলে গেলো। বাড়িতে গিয়ে মালা তার বাবাকে সব খুলে বললো। তার বাবা শুনে রাগান্বিত স্বরে বললো- "সামান্য রাখালকে তুমি ভালোবাসো। আমার কি মান সম্মান বলতে কিছু নেই। দেশে কি ছেলের অভাব পড়েছে"। মালা কেঁদে কেঁদে বললো- "বাবা, আমি তোমার একমাত্র কন্যা। তুমি কি আমার ভালো চাও না। রাখাল হলেও সে মানুষ। আমার শরীরে যে রক্ত আছে তার শরীরে সে একই রক্ত আছে"। মেয়ের কথাগুলো শুনে জমিদার চিন্তায় পড়ে গেলো আর মনে মনে বলতে লাগলো আমার মা' মরা একমাত্র মেয়ে। মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললো, ঠিক আছে মা' তুমি যা চাও তাই হবে। আগামীকাল রাখালকে আমাদের বাড়িতে আসতে বলো। মালা তার বাবার কথায় খুবই খুশি হলো। পরের দিন, মালা হিজল বনে গিয়ে মোহনকে বললো- "বাবা, তোমাকে আমাদের বাড়ি যেতে বলেছে"। মোহন কথাগুলো শুনে ভয় পেয়ে গেলো। মনে মনে বলতে লাগলো আমি আজ শেষ। যাই হোক না কেন, জমিদারের কথা মানতে হবে। এই ভেবে মোহন মালাদের বাড়ি গেল এবং ভয়ে ভয়ে জমিদারকে সালাম দিলো। জমিদার মোহনকে দেখে অবাক হয়ে গেলো আর মনে মনে বলতে লাগলো এতো সুন্দর ছেলে রাখালের কাজ করে। সারাদিন রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে মাঠে গরু চরায়। জমিদার মোহনকে বললো- "তোমার বাবা-মা আছে"। কেঁদে কেঁদে সে উত্তর দিলো, আমার বাবা-মা কেউই বেঁচে নেই। আমি এতিম। বৃদ্ধ দাদা-দাদির কাছেই বড় হয়েছি। এই কথাগুলো শুনে জমিদারও মনে কষ্ট পেলো। জমিদার মোহনকে বললো- "বাবা মোহন, আমার মালা তোমাকে ভালোবাসে। তুমি যদি রাজি থাকো তাহলে আগামী শুক্রবার তোমাদের বিয়ে দিবো"। জমিদারের কথা শুনে মোহনের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লো। মোহন বললো- "আমার দাদা-দাদির সাথে কথা বলে আপনাকে জানাবো"। ঐ দিন রাতেই মোহন তার দাদা-দাদিকে বিয়ের বিষয়ে সব খুলে বললো। তারা তাকে বললো- "জমিদার খুবই ভালো লোক। জমিদার যদি মেয়েকে বিয়ে দিতে রাজি হয় তাহলে আমাদের আর বলার কিছু নেই"। মোহন সাথে সাথে জমিদারকে তার প্রস্তাব জানিয়ে দিলো। শুক্রবার দিন জমিদার এলাকার লোকজন নিয়ে মোহন এবং মালার বিয়ে ধুমধামের মাধ্যমে সম্পন্ন করলেন। বিয়ের কিছুদিন পর, জমিদার মোহনের পরিবারকে তাদের বাড়িতে নিয়ে আসলেন এবং সুখে শান্তিতে সবাই মিলেমিশে বসবাস করতে লাগলেন।

 

সূত্র: সেবা হট নিউজ — সত্য প্রকাশ্যে আপোষহীন

সর্বশেষ খবর পেতে আমাদের ফলো করুন:

কে কাকে তৈরি করে—লেখক, নাকি লেখা?
কে কাকে তৈরি করে—লেখক, নাকি লেখা?
ঘুড়ি পাগল রাজু: মোঃ সৈয়দুল ইসলাম
ঘুড়ি পাগল রাজু: মোঃ সৈয়দুল ইসলাম
জামালপুরে ৫টি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন
জামালপুরে ৫টি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন
বর্ধমান হাউস : কাজী নজরুল ইসলাম ও মুসলিম সাহিত্য সমাজ
বর্ধমান হাউস : কাজী নজরুল ইসলাম ও মুসলিম সাহিত্য সমাজ
আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু : অনন্য সাধারণ একজন অনুবাদক
আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু : অনন্য সাধারণ একজন অনুবাদক

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

খবর/তথ্যের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, সেবা হট নিউজ এর দায়ভার কখনই নেবে না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Know about Cookies
Ok, Go it!
To Top