![]() |
| কে কাকে তৈরি করে—লেখক, নাকি লেখা? |
কে কাকে তৈরি করে—লেখক, নাকি লেখা?
দীর্ঘ প্রবাসজীবনে লেখালেখির সঙ্গে আমার সম্পর্ক কখনোই শুধু পাঠকের সামনে নিজের কথা তুলে ধরার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। জীবনের নানা সময়ে যা দেখেছি, যেসব মানুষ ও ঘটনার মুখোমুখি হয়েছি, যে প্রশ্নগুলোর উত্তর সঙ্গে সঙ্গে পাইনি—সেগুলোই ধীরে ধীরে আমার ভাবনার অংশ হয়ে উঠেছে। পরে কোনো এক সময়ে মনে হয়েছে, এসব অভিজ্ঞতাকে শুধু মনে ধরে রাখলে হবে না; তাদের ভাষা দিতে হবে। সেই তাগিদ থেকেই শুরু হয় লেখা।
কিন্তু বছরের পর বছর লিখতে লিখতে আমার নিজের কাছেই একটি প্রশ্ন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—আমি কি শুধু আমার দেখা জীবন, অভিজ্ঞতা ও চিন্তা থেকে লেখা তৈরি করছি, নাকি লেখার মধ্য দিয়েই আমার দেখার চোখও বদলে যাচ্ছে?
আজ পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়, লেখক ও লেখার সম্পর্ক এতটা সরল নয়। একটি লেখা শেষ করার পর বিষয়টি শেষ হয়ে যায় না; বরং কখনো কখনো সেই লেখাই লেখককে তাঁর নিজের চিন্তার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। যে বিষয়কে একসময় সহজ মনে হয়েছিল, পরে তার জটিলতা ধরা পড়ে; যে সিদ্ধান্তকে নিশ্চিত মনে হয়েছিল, নতুন অভিজ্ঞতা তাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। দীর্ঘ জীবন ও প্রবাসের অভিজ্ঞতা আমাকে অন্তত এটুকু শিখিয়েছে—চিন্তা থেমে গেলে অভিজ্ঞতার মধ্যেও নতুন কিছু আবিষ্কারের সুযোগ কমে যায়। তাই আজকের প্রশ্নটি শুধু লেখালেখি নিয়ে নয়; এটি একজন লেখকের নিজের কাছেও এক ধরনের আত্মজিজ্ঞাসা—কে কাকে তৈরি করে, লেখক নাকি লেখা?
কাগজে নামার আগেই লেখার জন্ম
একটি লেখা কাগজে নামার অনেক আগেই মানুষের মনে তার শুরু হয়ে যায়। প্রতিদিন আমরা অসংখ্য মানুষ দেখি, নানা কথা শুনি, বিভিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে যাই। অধিকাংশই সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যায়; কিছু থেকে যায়, কারণ সেগুলো কোনো প্রশ্ন তৈরি করে। কোনো আচরণ মনে দাগ কাটে, কোনো বৈপরীত্য অস্বস্তি তৈরি করে, কোনো ঘটনা নিজের পরিচিত ধারণাকেই নাড়া দেয়।
সেই প্রশ্নের উত্তর সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া যায় না। জীবনের ব্যস্ততা মানুষকে অন্যদিকে নিয়ে যায়, কিন্তু ঘটনাটি মনের ভেতর থেকে যায়। পরে নতুন কোনো অভিজ্ঞতা পুরোনোটির সঙ্গে যুক্ত হলে আগের দৃশ্যটিও অন্য আলোয় দেখা যায়। তখন যে বিষয়টি একসময় বিচ্ছিন্ন ঘটনা মনে হয়েছিল, তার মধ্যে বৃহত্তর কোনো বাস্তবতার ইঙ্গিত ধরা পড়তে পারে।
একজন লেখকের দীর্ঘ জীবন এই অর্থে এক ধরনের অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার। সেখানে থাকে মানুষের সঙ্গে পরিচয়, ভুল থেকে পাওয়া শিক্ষা, সময়ের পরিবর্তন, সম্পর্কের ওঠানামা, সিদ্ধান্তের ফল এবং নিজের দেখা পৃথিবী সম্পর্কে ক্রমশ বদলে যাওয়া ধারণা। সবকিছু লেখায় আসে না; সময়ের সঙ্গে যার অর্থ স্পষ্ট হয়ে ওঠে, লেখক সাধারণত সেটিই তুলে ধরেন।
দীর্ঘ প্রবাসজীবন এই দেখার পরিসরকে আরও বিস্তৃত করতে পারে। নিজের সমাজকে কিছুটা দূরত্ব থেকে দেখা যায়, আবার যে সমাজে বসবাস করা হচ্ছে, তার বাস্তবতাকেও দীর্ঘ সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে বোঝা যায়। দুই অভিজ্ঞতার মাঝখানে দাঁড়ালে তুলনা অনিবার্য; কিন্তু সেই তুলনার মূল্য তখনই, যখন তা অন্ধ প্রশংসা বা অন্ধ সমালোচনায় আটকে না থেকে নিজের ধারণাকেও যাচাই করতে শেখায়। দূরত্ব কখনো বিচ্ছিন্নতা তৈরি করে, আবার কখনো পরিচিত বাস্তবতাকে নতুন চোখে দেখার সুযোগ দেয়।
লিখতে বসলে নিজের সঙ্গেই দেখা হয়
মনে মনে কোনো বক্তব্য যতটা পরিষ্কার মনে হয়, লিখতে গেলে তার সবটা ততটা পরিষ্কার থাকে না। একটি মতামতকে যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করতে গেলেই প্রশ্ন ওঠে—এর ভিত্তি কী, তথ্য কতটা নির্ভরযোগ্য, অন্য কোনো ব্যাখ্যা সম্ভব কি না, নিজের অভিজ্ঞতাকে কি ভুল করে বৃহত্তর বাস্তবতা ধরে নেওয়া হচ্ছে?
এই জায়গাতেই লেখার আসল পরীক্ষা। পাঠককে বোঝাতে গিয়ে লেখক নিজের চিন্তাকেও যাচাই করেন। কোনো বক্তব্য লিখতে গিয়ে অবস্থান আরও দৃঢ় হতে পারে, আবার নতুন তথ্যের কারণে পুরোনো ধারণা সংশোধনের প্রয়োজনও হতে পারে। কোনো প্রশ্নের উত্তর না মিললে সেটিকে উত্তরহীন প্রশ্ন হিসেবেই রেখে দেওয়া কখনো কখনো বেশি সৎ।
নিজের কথাকে সংশোধন করার ক্ষমতা একজন লেখকের পরিণতির লক্ষণ। সব সময় পুরোনো বক্তব্যকে রক্ষা করার চেষ্টা চিন্তার শক্তি নয়। নতুন বাস্তবতার সামনে নিজের ধারণাকে পুনর্বিবেচনা করার সাহসই বরং চিন্তাকে জীবন্ত রাখে।
তীক্ষ্ণ লেখার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। কঠিন শব্দ, দীর্ঘ বাক্য কিংবা উচ্চকণ্ঠ বক্তব্য দিয়ে লেখা ধারালো হয় না। একটি নির্ভুল তথ্য, একটি অসংগতির স্পষ্ট ব্যাখ্যা কিংবা একটি যথার্থ প্রশ্ন অনেক সময় তার চেয়ে বেশি শক্তিশালী। পাঠককে উত্তেজিত করা সহজ; তাকে নিজের অবস্থান নিয়ে ভাবতে বাধ্য করা কঠিন।
একজন পরিণত লেখক তাই পাঠকের হয়ে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন না। তিনি তথ্য ও যুক্তি সামনে রাখেন, বৈপরীত্য দেখান, প্রয়োজনীয় প্রশ্নটি উত্থাপন করেন এবং পাঠককে নিজের সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ দেন। একটি ভালো লেখা পাঠককে লেখকের সঙ্গে একমত করবেই—এমন নয়; দ্বিমত করেও যদি পাঠক কিছুক্ষণ থেমে ভাবেন, লেখাটি তার কাজ করেছে।
জনপ্রিয়তার চেয়ে বিশ্বাসযোগ্যতা
একটি লেখা প্রকাশের পর প্রশংসা পাওয়া আনন্দের, সমালোচনাও লেখককে ভাবায়। কিন্তু এগুলোর কোনোটিই দীর্ঘমেয়াদে একজন লেখকের পরিচয়ের ভিত্তি নয়। পাঠকের আস্থা তৈরি হয় তথ্য ব্যবহারের সততা, যুক্তির শৃঙ্খলা এবং নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করার ক্ষমতা থেকে।
একজন লেখক ভুল করতেই পারেন। কোনো তথ্য অসম্পূর্ণ হতে পারে, কোনো সিদ্ধান্তের পরে সংশোধনের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। এতে তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হয় না। বরং তা ক্ষুণ্ন হয় তখন, যখন ভুল বুঝেও তিনি তা আঁকড়ে থাকেন অথবা নিজের বক্তব্য রক্ষা করতে গিয়ে তথ্যকে উপেক্ষা করেন।
নতুন তথ্য সামনে এলে নিজের অবস্থান সংশোধন করা পরাজয় নয়; বরং সেটিই চিন্তার পরিণতির পরিচয়। পাঠক শেষ পর্যন্ত এমন লেখকের ওপরই আস্থা রাখেন, যিনি তাঁকে প্রভাবিত করার চেয়ে বিষয়টি যথাসম্ভব স্পষ্ট ও নির্ভুলভাবে তুলে ধরতে সচেষ্ট।
সময়ের সামনে লেখার পরীক্ষা
প্রকাশের মুহূর্তে একটি লেখা যতই আলোচিত হোক, সময়ের সামনে তার কোনো বিশেষ সুবিধা নেই। পরিস্থিতি বদলে যায়, নতুন তথ্য আসে, মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিও পরিবর্তিত হয়। তখন কোনো লেখা হারিয়ে যায়, আবার কোনো লেখা বহু বছর পরও নতুন পাঠকের কাছে ফিরে আসে।
যে লেখায় শুধু একটি মুহূর্তের আবেগ থাকে, তার স্থায়িত্ব সাধারণত সীমিত। কিন্তু যে লেখায় মানুষের আচরণ, জীবনের কোনো স্থায়ী প্রশ্ন কিংবা সময়ের গভীর পরিবর্তন ধরা পড়ে, তার প্রাসঙ্গিকতা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। এই অর্থে সময়ই লেখকের সবচেয়ে কঠিন সম্পাদক। সে লেখকের পরিচিতি বা জনপ্রিয়তার দিকে তাকায় না; দেখে, লেখাটির ভেতরে কতটা স্থায়ী চিন্তা ছিল।
দীর্ঘ অভিজ্ঞতার একজন লেখকের জন্য এই পরীক্ষার গুরুত্ব আরও বেশি। বহু বছরের পরিবর্তন চোখের সামনে দেখা থাকলে বর্তমানকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার প্রবণতা কমে। আজকের কোনো ঘটনার পেছনে গতকালের কোন বাস্তবতা কাজ করছে এবং তার প্রভাব আগামী দিনে কোথায় গিয়ে পৌঁছাতে পারে—এই ধারাবাহিকতা বোঝার সুযোগ তৈরি হয়। ফলে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও কখনো বৃহত্তর সময়ের একটি দলিল হয়ে উঠতে পারে।
পুরোনো লেখার সামনে দাঁড়ানো
লেখা প্রকাশের পর পাঠকেরা সেটি পড়েন, কিন্তু সময় পেরিয়ে গেলে লেখক নিজেও নিজের লেখার একজন পাঠক হয়ে ওঠেন। কয়েক বছর পর পুরোনো লেখা পড়লে নিজের ভাষা পরিচিত লাগলেও চিন্তার কিছু অংশ অপরিচিত মনে হতে পারে। কোনো বক্তব্য অপরিণত বলে মনে হতে পারে, কোনো সিদ্ধান্ত অতিরিক্ত সরল মনে হতে পারে, আবার কোনো প্রশ্ন আজও আগের মতোই প্রাসঙ্গিক থাকতে পারে।
এই ফিরে দেখা অস্বস্তিকর হলেও মূল্যবান। কারণ মানুষ বদলায়, আর তার সঙ্গে বদলে যায় অভিজ্ঞতার অর্থও। আজকের উপলব্ধি গতকালের অভিজ্ঞতাকে মুছে দেয় না; বরং তার ওপর নতুন আলো ফেলে। একজন লেখকের বিকাশও অনেকটা এভাবেই ঘটে—পুরোনো চিন্তাকে অস্বীকার করে নয়, নতুন অভিজ্ঞতার আলোয় তাকে পুনরায় বিচার করে।
সেখানেই লেখার সঙ্গে লেখকের সম্পর্ক অন্য মাত্রা পায়। লেখক তাঁর জীবন থেকে লেখার উপাদান নেন, কিন্তু লেখা শেষ পর্যন্ত সেই জীবনকেই নতুন করে পড়ার সুযোগ দেয়।
তাহলে কে কাকে তৈরি করে?
লেখক ছাড়া লেখা জন্ম নেয় না। তাঁর অভিজ্ঞতা, চিন্তা, পর্যবেক্ষণ, পড়াশোনা ও ভাষাই একটি লেখার ভিত্তি। কিন্তু লেখা তৈরি হয়ে গেলে তার প্রভাব কাগজে থেমে থাকে না। নিজের বক্তব্যকে দৃশ্যমান করে তোলার পর লেখক আর সেটিকে আগের মতো এড়িয়ে যেতে পারেন না; তাঁকে তা যাচাই করতে হয়, প্রশ্ন করতে হয়, প্রয়োজন হলে সংশোধনও করতে হয়। এই সম্পর্ক তাই একমুখী নয়। লেখক তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে লেখা তৈরি করেন, আর লেখা সেই অভিজ্ঞতাকে নতুনভাবে দেখার সুযোগ দেয়। একটি লেখা শেষ হয়, কিন্তু তার প্রশ্ন থেকে যেতে পারে; সেই প্রশ্নই পরবর্তী চিন্তার ভিত তৈরি করে।
শেষ পর্যন্ত একজন লেখকের পরিচয় শুধু কতগুলো লেখা প্রকাশিত হয়েছে, তা দিয়ে নির্ধারিত হয় না। তিনি কী দেখেছেন, কতটা গভীরভাবে দেখেছেন, নিজের চিন্তাকে কতবার প্রশ্ন করেছেন এবং সময়ের সঙ্গে নিজের অবস্থান কতটা পরিণত করতে পেরেছেন—সেখানেই তাঁর লেখকসত্তার প্রকৃত মূল্য। তাই প্রশ্নটির উত্তর সম্ভবত কোনো একদিকে নয়।
লেখক লেখাকে তৈরি করেন, কিন্তু ভালো লেখা লেখককেও আগের অবস্থায় থাকতে দেয় না।
কলম লেখকের হাতে থাকে, কিন্তু লেখা একবার প্রকাশ পেলে তা আবার লেখকের কাছেই ফিরে আসে—চিন্তার প্রশ্ন হয়ে, আত্মসমালোচনার সুযোগ হয়ে, কখনো নিজের পুরোনো অবস্থানের সীমাবদ্ধতা দেখিয়ে। সেই ফিরে আসার মধ্য দিয়েই লেখক নিজের পরবর্তী রূপে পৌঁছান।
হয়তো একজন লেখকের সবচেয়ে বড় অর্জন শুধু নতুন কোনো লেখা প্রকাশ করা নয়; বরং প্রতিটি লেখার মধ্য দিয়ে আরও গভীরভাবে দেখা, আরও সতর্কভাবে ভাবা এবং প্রয়োজনে নিজের কথাকেও প্রশ্ন করতে শেখা। তখন লেখালেখি শুধু প্রকাশের মাধ্যম থাকে না; তা হয়ে ওঠে নিজেকে বোঝারও একটি পথ।
আর সেখানেই মূল প্রশ্নটির নতুন অর্থ তৈরি হয়—কে কাকে তৈরি করে, লেখক নাকি লেখা?
হক মোঃ ইমদাদুল,
২৭শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ইং





খবর/তথ্যের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, সেবা হট নিউজ এর দায়ভার কখনই নেবে না।